September 12, 2026

‘শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে সময় নির্ধারণ করলে হবে না’

0
barishal-2-20260912130350.jpg


‘সকাল হইতে ৬ ঘণ্টা জাল বাইয়া একটা ইলিশ মাছ পাইছি। নদীতে আগের মতোন মাছ নাই। এমন চলতে থাকলে ধার দেনা শোধ করতে জাল বেঁচা ছাড়া কোনো উপায় নাই। হের মধ্যে হোনতে আছি কয়দিন পর মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু ওইবে। এই নিষেধাজ্ঞা আইলেও কোনো কাজ হয় না, নিষেধাজ্ঞার সময় আরও কিছুদিন পর দেওয়া দরকার।’ নদীতে আগের মতো মাছ না পাওয়ার ক্ষোভে জাগো নিউজকে কথাগুলো বলছিলেন বরিশাল জেলার মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার নিবন্ধিত জেলে ইউনুস মাঝি।

তিনি বলেন, সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও দেখা যায় ধরা পড়া সব ইলিশের পেটে ডিম। তাহলে সরকার যে ইলিশের ডিম ছাড়ার মৌসুম হিসেবে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করে তা কী দেখে করে। এই নিষেধাজ্ঞার সময় আরো এক মাস পরে নির্ধারণ করা দরকার। তানা হলে ইলিশ শিকারে নিষেধাজ্ঞার যত আয়োজন তা কোনো কাজেই আসবে না।

তার মতো একই দাবি জেলার হিজলা উপজেলার জেলে জালাল উদ্দিনের। তিনি বলেন, নদীতে এখনো ইলিশের চাপ কম, ডিমওয়ালা ইলিশের দেখা কম, আরও কয়েক দিন সময় দিলে ভালো ফল পাওয়া যাবে। নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন যদি ইলিশের প্রকৃত প্রজনন সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি না মেলে, তাহলে এর সুফল পাওয়া যাবে না। তাই সরকারের উচিত বিষয়টি পুনঃবিবেচনা করে দেখার।

একই দাবি জানিয়েছেন বরিশালের কীর্তনখোলা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে খোরশেদ আলম। তিনি বলেন, ‘গত কয়েক বছর ধরে দেখে আসছি সরকারের দেওয়া নিষেধাজ্ঞার পর প্রচুর পরিমাণে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা পড়ে। যদি নিষেধাজ্ঞার পরও ইলিশের পেটে ডিম থাকে তাহলে ইলিশের প্রজনন মৌসুম কী দেখে নির্ধারণ করা হয়। শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা দেখে সময় নির্ধারণ করলে হবে না। নদীর বাস্তব চিত্র দেখে নিষেধাজ্ঞার সময় নির্ধারণ করতে হবে।’

জেলেদের দাবি, নদীতে এখনো ইলিশের আশানুরূপ দেখা মিলছে না। কারও জালে ধরা পড়ছে অল্পসংখ্যক ইলিশ, আবার কারও জাল ফিরছে প্রায় খালি। এর মধ্যেই আগামী ৪ অক্টোবর থেকে মা ইলিশ সংরক্ষণে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু হওয়ার কথা। তাই শুধু ক্যালেন্ডারের নির্দিষ্ট তারিখ ধরে নয়, নদীর পানির অবস্থা, ইলিশের গতিবিধি এবং ডিম ছাড়ার প্রকৃত সময় বিবেচনায় নিয়ে নিষেধাজ্ঞা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।

জেলেরা বলছেন, নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য নিয়ে তাদের কোনো আপত্তি নেই। মা ইলিশ রক্ষা করা গেলে ভবিষ্যতে নদীতে ইলিশের উৎপাদন বাড়বে এটা তারাও বোঝেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার ২২ দিন যদি ইলিশের প্রকৃত প্রজনন সময়ের সঙ্গে পুরোপুরি না মেলে, তাহলে এর সুফল কতটা পাওয়া যাবে?

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের অন্য সময়ের তুলনায় এই সময় তাদের কাছে আয়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখনই নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু মাছ ধরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন তারা। নিষেধাজ্ঞা শুরু হলে নৌকা, জাল ও মাছ ধরার সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদেরও ঘরে বসে থাকতে হবে। তাই নিষেধাজ্ঞার সময় আরও কয়েক দিন পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলার হিজলা উপজেলার মাছ ব্যবসায়ী ও দাদনদাতা মো. আব্দুল কাদের জাগো নিউজকে বলেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ নিয়ে সরকারের কাজ করা দরকার। দীর্ঘ কয়েক বছর ধরেই এই অক্টোবর মাসে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়, কিন্তু অক্টোবর শেষেও ইলিশের পেটে ডিম থাকে। তাই প্রজনন মৌসুমের উপযুক্ত সময় আরও কিছুদিন পিছিয়ে দিলে এর সুফল সবাই ভোগ করতে পারবে।

এ ব্যবসায়ী আরও বলেন, নিষেধাজ্ঞার সময় সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হলেও তা জেলেদের প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে নিষেধাজ্ঞার দিনগুলোতে সংসার চালানো, নৌকার খরচ, জাল মেরামত কিংবা ধারদেনা পরিশোধ নিয়ে তাদের দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। তাই জেলেদের সহায়তার বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত।

আরেক আড়তদার মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, নিষেধাজ্ঞা থাকুক, তবে তা যেন মা ইলিশের প্রকৃত প্রজনন সময়কে কেন্দ্র করে হয়। এতে একদিকে যেমন ইলিশের প্রজনন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে জেলেরাও নিষেধাজ্ঞার যৌক্তিকতা সহজে মেনে নিতে পারবেন।

এ বিষয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মা ইলিশ সংরক্ষণের মূল লক্ষ্য অক্ষুণ্ন রেখেই বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। জেলেদের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞার সময় পেছানোর যে দাবি উঠেছে, সেটিও সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে বরিশাল মৎস্য অধিদপ্তরের সিনিয়র সহকারী পরিচালক আনিসুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, জেলেদের দাবি ও নদীর বাস্তবতা দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে আলোচনা চলছে। যাতে জেলে ও ইলিশ দুই পক্ষই উপকৃত হয়, সেজন্য নিষেধাজ্ঞার সময় ১৫ দিন পিছিয়ে দেওয়ার একটি প্রস্তাবনা বিভাগীয় পর্যায়ে রয়েছে।

শাওন খান/কেজে/এএসএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *