September 6, 2026

মানবাধিকার, গুম প্রতিরোধ ও সম্পত্তি হস্তান্তরে তিন বিল সংসদে পাস

0
pm1-mtelh5zx63aq83y-20260829222918.jpg


মানবাধিকার সুরক্ষা জোরদার, গুমকে (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত ও দণ্ডনীয় করা এবং সম্পত্তি হস্তান্তরে আজীবন ভোগদখলের অধিকার প্রবর্তনের লক্ষ্যে তিনটি বিল জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম কণ্ঠভোটে বিলটি পাস করেন। তবে এই তিনটি বিলের বিরোধিতা করে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধীদল। তিনটি বিলের পাসের কারণে আজকের দিনকে কালো দিন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে বিরোধীদল। ২০০৯ সালের ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন’ রহিত করে একটি কার্যকর ও স্বাধীন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল, ২০২৬’ পাস করা হয়।

‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল, ২০২৬’ এ গুমের শাস্তি হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। ভিকটিমের মৃত্যু হলে বা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ থাকলে অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং এক কোটি টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা যাবে।

‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এর মাধ্যমে আজীবন ভোগদখলাংশের আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে সম্পত্তি প্রদানকারী তার জীবদ্দশায় হস্তান্তরিত সম্পত্তি ব্যবহার ও ভোগ করার অধিকার বজায় রাখতে পারবেন।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল’ এবং ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল’ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল’ সংসদে পাসের জন্য উত্থাপন করেন। অধিকার সংক্রান্ত বিলগুলো পাসের জন্য তোলা হলে বিরোধীদলের সংসদ সদস্যরা ওয়াকআউট করেন।

ওয়াকআউটের আগে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার করার ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতির সুযোগ রাখা হয়েছে। তিনি জানান, সাধারণ কোনো ব্যক্তি মানবাধিকার লঙ্ঘন করলে কমিশন সরাসরি তা তদন্ত করতে পারবে; কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা নিরাপত্তার কোনো সদস্য জড়িত থাকলে প্রথমে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে জানাতে হবে এবং তাদের জবাব চাইতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দুর্বল আইন পাসের অংশীদার না হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকেই তারা এই আলোচনায় অংশ না নিয়ে ওয়াকআউট করছেন।

নতুন মানবাধিকার কমিশন বিলে বলা হয়েছে, একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। যার মধ্যে অন্তত একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বা অনগ্রসর সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি থাকবেন। বাছাই কমিটির সুপারিশে এসব সম্প্রদায় থেকে যোগ্য প্রার্থীরা অগ্রাধিকার পাবেন। এই কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং ওই সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা থাকবেন।

বিলটিতে কমিশনের এখতিয়ার স্পষ্ট ও অভিযোগ প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালীন ভিকটিমকে তাৎক্ষণিক হুমকি ও ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারির ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের ঐচ্ছিক প্রোটোকল অনুুসারে ‘জাতীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা’ ইউনিট গঠন করা একটি মূল বিষয়, যা নির্যাতন, হেফাজতে মৃত্যু ও গুম প্রতিরোধে কাজ করবে।

গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিলে গুমকে আমলযোগ্য, অসংযোগযোগ্য ও অ-আপসযোগ্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। সরকারি কর্মচারী বা কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য তাদের সরকারি দায়িত্বে অথবা সরকারের অনুমতি বা সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার, আটক বা অপহরণ করার পর তা অস্বীকার করলে বা তথ্য গোপন করলে তা গুম হিসেবে গণ্য হবে।

আদালত নিখোঁজ ব্যক্তিদের খোঁজে তল্লাশি পরোয়ানা জারি করতে পারবেন। বিলে অনুপস্থিতিতে বিচার , ডিজিটাল সাক্ষ্য গ্রহণ এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী ও ভিকটিমের সুরক্ষার বিধান রাখা হয়েছে। ভিকটিম ও তাদের পরিবার তদন্তের হালনাগাদ তথ্য জানতে পারবে।

সরকারি খরচে আইনি সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও বিশেষ তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সাজাপ্রাপ্তদের সম্পত্তি থেকে এই ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে; আর তা সম্ভব না হলে রাজ্য এই ব্যয় বহন করবে।

গুম হওয়া ব্যক্তির সম্পত্তি তার স্ত্রী ও নির্ভরশীলরা মেইনটেন্যান্স বা জীবনযাত্রার খরচে ব্যবহার করতে পারবেন। পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকার প্রক্রিয়ার জন্য ‘গুমের সনদ’ দেওয়া হবে। তবে, স্বাধীন কোনো তদন্তকারী সংস্থা তৈরি করা হয়নি; গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের ওপরই থাকছে। বিলে তদন্ত ও বিচার ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে।

‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল’ এর মাধ্যমে ১৮৮২ সালের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সংশোধন করা হয়েছে। বাবা-মা বা অন্যান্য যোগ্য ব্যক্তিরা নিকটাত্মীয়দের সম্পত্তি দান করলেও নিজের জীবদ্দশায় তা ভোগের অধিকার ধরে রাখতে পারবেন। এতে ১২২এ এবং ১২২বি নামে নতুন দুটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এটি সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য হবে। এতে সাধারণ দান বা মুসলিম আইনের হেবা ব্যাহত হবে না।

বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সম্পত্তি হস্তান্তর বিলে জনমত যাচাইয়ের দাবি জানান এবং এটি কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থী বলে দাবি করেন। তবে তাদের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে খারিজ হলে তারা সাময়িক ওয়াকআউট করেন।

গত ২৭ আগস্ট বিলগুলো প্রথম সংসদে পেশ করা হয়েছিল এবং দুই কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। পরবর্তীকালে আইন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি কিছু সংশোধনের সুপারিশ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বেশ কয়েকটি অধ্যাদেশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই আইনগুলো পাস করা হলো।

এমওএস/এমএমকে



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *