September 3, 2026

ভেনেজুয়েলার তেল গিলছে যুক্তরাষ্ট্র, আসল লাভ কার?

0
venezuela-oil-mt08z3uh8jfljz7-20260819213122.jpg


ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলভাণ্ডারের নিয়ন্ত্রণ নিতে নতুন চুক্তি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ২৮ আগস্ট এই চুক্তিকে ‘বিশ্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় তেল চুক্তি’ বলে উল্লেখ করেন।

তিনি দাবি করেন, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত দ্বিগুণের বেশি করবে। একই সঙ্গে, মার্কিণ নাগরিকদের জন্য জ্বালানির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে দাবি করেন তিনি।

তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাস্তবে এই চুক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে অল্প সময়ে তেলের দাম কমার সম্ভাবনা নেই।

৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের নিয়ন্ত্রণ

ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রমাণিত তেলের মজুত রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসাবে, দেশটির মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন (৩০ হাজার ৩০০ কোটি) ব্যারেল। এটি বিশ্বের মোট প্রমাণিত তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ।

নতুন চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ৬৫ বিলিয়নের বেশি ব্যারেল প্রমাণিত তেলের নিয়ন্ত্রণ পাবে। এটি দেশটির মোট পরিচিত তেল মজুতের এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি।

তবে ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। এই তেল উত্তোলন ও পরিশোধন তুলনামূলকভাবে ব্যয়বহুল।

কার হাতে যাচ্ছে তেলের নিয়ন্ত্রণ

হোয়াইট হাউজের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্সের সঙ্গে একটি বেসরকারি যৌথ উদ্যোগ তৈরি করছে।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক ভেনেজুয়েলার ধনকুবের আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ট। তিনি দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের সাবেক মিত্র ছিলেন।

ভেনেজুয়েলায় তেল উৎপাদনে মার্কিন কোম্পানি শেভরনের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম অপারেটর নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স। চুক্তিতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের অফিস অব স্ট্র্যাটেজিক ক্যাপিটালের ৩৫ শতাংশ অংশীদারত্ব থাকবে।

যৌথ উদ্যোগটির দৈনিক প্রায় দুই লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র উৎপাদিত তেলের ২০ শতাংশ উৎপাদন খরচের দামে কেনার অধিকার পাবে।

এখনই কমছে না তেলের দাম

চুক্তি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের দাম বরং বেড়েছে।

কোপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক জোহানেস রাউবাল বলেন, চুক্তির আগে যুক্তরাষ্ট্রের ডব্লিউটিআই অপরিশোধিত তেল প্রতি ব্যারেল ৮৩ থেকে ৮৬ ডলারে লেনদেন হচ্ছিল। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল প্রতি ব্যারেল ৮৫ থেকে ৮৮ ডলারের মধ্যে।

এরপর ডব্লিউটিআই ৯০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। ব্রেন্টের দামও ৯৫ ডলারের ওপরে ওঠে।

এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ বিঘ্নকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকেরা।

ভেনেজুয়েলার তেল তুলতে লাগবে বহু বছর

বিশ্লেষকদের মতে, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল মজুত থাকলেও তা দ্রুত বাজারে আনা সম্ভব নয়।

দেশটির তেল অবকাঠামোর বড় অংশ পুরোনো। পাইপলাইন ব্যবস্থায় সমস্যা রয়েছে। বিদ্যুৎ সরবরাহও পর্যাপ্ত নয়।

এ ছাড়া ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতের জন্য বিশেষায়িত অবকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে।

রাউবালের মতে, চুক্তির কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের তেল শোধনাগারগুলোও এরই মধ্যে প্রায় পূর্ণ সক্ষমতায় চলছে।

তাই ভেনেজুয়েলার অতিরিক্ত তেল এলেও তাৎক্ষণিকভাবে পাম্পের দাম কমানোর মতো প্রভাব তৈরি হবে না।

হরমুজ প্রণালির ঘাটতি পূরণ করতে পারবে ভেনেজুয়েলা?

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বের জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের ২০ শতাংশের বেশি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। হরমুজ বন্ধ হওয়ার পর ব্রেন্ট তেলের দাম একপর্যায়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়।

তাই ভেনেজুয়েলার অতিরিক্ত তেল উৎপাদন এই ঘাটতি পূরণ করতে পারবে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের ফ্রেডেরিক স্নাইডার বলেন, হরমুজ দিয়ে বাজারে আসা তেলের ঘাটতি ভেনেজুয়েলা পূরণ করতে পারবে না।

এর একটি কারণ হলো, ভেনেজুয়েলার তেল ভারী ও সালফারসমৃদ্ধ। অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা অনেক তেল তুলনামূলকভাবে হালকা। ফলে দুই ধরনের তেল একইভাবে বাজারে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।

আসল লাভ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোর

বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো।

চুক্তি ঘোষণার পর ভেনেজুয়েলায় বর্তমানে সক্রিয় বড় মার্কিন তেল কোম্পানি শেভরনের শেয়ারের দাম ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানিমন্ত্রী ক্রিস রাইটও জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলায় আরও কয়েকটি আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানি বিনিয়োগ করতে পারে। এর মধ্যে শেভরন, ইতালির এনিই, ভারতের ওএনজিসি, কলম্বিয়ার জিওপার্ক এবং যুক্তরাষ্ট্রের জিই ভারনোভা থাকার কথা রয়েছে।

আছে তেলের ভাণ্ডার, সঙ্গে ঝুঁকিও

১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে দৈনিক ৩০ লাখ ব্যারেলের বেশি ছিল। এরপর বিনিয়োগের ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে দেশটি প্রতিদিন প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করছে।

ভেনেজুয়েলায় নতুন করে বিনিয়োগ করতে কোম্পানিগুলোকে বড় অংকের অর্থ ব্যয় করতে হবে। দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতিও অনিশ্চিত।

তাই দীর্ঘমেয়াদে তেল উৎপাদন বাড়লেও কতটা বাড়বে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

ফলে ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার তেল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ অল্প সময়ের মধ্যে জ্বালানির কম দাম পাবেন— এমন সম্ভাবনা এখনো দেখা যাচ্ছে না।

বরং চুক্তির তাৎক্ষণিক ও সবচেয়ে স্পষ্ট সুবিধা পেতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলো।

সূত্র: আল-জাজিরা
কেএএ/



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *