বাথরুমে বন্দি রাখা হতো শিশু তানিয়াকে, নির্যাতনে শরীরে পচন
বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার বয়স শিশু তানিয়ার। অথচ অভাবের সংসারে জন্ম নেওয়ায় সেই বয়সেই তাকে নিতে হয়েছে জীবনের কঠিন বাস্তবতার বোঝা। প্রায় দেড় বছর আগে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করতে ঢাকায় যায় খাগড়াছড়ির মাটিরাঙ্গা উপজেলার করল্যাছড়ির রশিদ মিস্ত্রী পাড়ার বেলাল হোসেনের মেয়ে তানিয়া (১১)। কিন্তু সেখানে গিয়ে দু’মুঠো খাবার ও নিরাপদ আশ্রয়ের বদলে তার ভাগ্যে জুটেছে ভয়াবহ নির্যাতন।
পরিবার ও ভুক্তভোগীর অভিযোগ, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করার সময় তানিয়ার ওপর দিনের পর দিন শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। তাকে একটি টয়লেটে বন্দি করে রাখা হতো। এমনকি গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেওয়া হয়েছে শরীরের বিভিন্ন স্থানে। নির্যাতনে তার শরীরের বিভিন্ন অংশে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে পা ও পিঠে পচন ধরতে শুরু করে।
অবশেষে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাত ৩টার দিকে খাগড়াছড়ি আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন ও ক্ষত নিয়ে বাড়ি ফেরার পর স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অবস্থার অবনতি হতে থাকায় চিকিৎসকরা তাকে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালে পাঠান।
বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলা সদর হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে তানিয়া। যন্ত্রণায় কাতর শিশুটির শরীরজুড়ে নির্যাতনের ক্ষতচিহ্ন। ক্ষতস্থানে পচন ধরায় তার চিকিৎসা নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
তানিয়ার বাবা বেলাল হোসেন বলেন, অভাবের কারণে মেয়েকে পাশের বাড়ির একজনের কথায় ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজে পাঠিয়েছিলেন তারা। কিন্তু সেখানে এমন নির্মম নির্যাতনের শিকার হবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। এখন মেয়েটি হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর প্রহর গুনছে।
তিনি আরও বলেন, আমি দিনমজুর, সংসারে অভাব-অনটনের কারণে মেয়েকে পড়াশোনা করানোর সামর্থ্য ছিল না। তার ওপর ৭ বছর বয়সেই মাকে হারিয়েছে তানিয়া। একদিকে মা নাই, অন্যদিকে অভাবের সংসার। সব মিলিয়ে শুরু থেকেই ছিল কঠিন।
তানিয়ার পরিবারের দাবি, ঢাকায় যে বাসায় সে কাজ করত, সেখানে ‘রাসেল’ নামে একজন ল্যাপটপ ব্যবসায়ী এবং তার স্ত্রী ‘ছোটন’, যিনি পেশায় শিক্ষক। তাদের পরিচয়, ঠিকানা ও নির্যাতনের ঘটনায় সংশ্লিষ্টতা তদন্ত করে আইনের আওতায় আনার আকুতি জানিয়েছে পরিবার। একই সঙ্গে শিশুটির উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রশাসন ও সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রিপল বাপ্পী চাকমা বলেন, শিশুটি সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে, তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে কয়েক মাস ধরে তার ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানোর কারণে তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। তার উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন।
খাগড়াছড়ি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট সৃজনী ত্রিপুরা বলেন, ভুক্তভোগীর পক্ষে কেউ মামলা করলে নির্যাতনকারীকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনা সম্ভব।
প্রবীর সুমন/এফএ
