September 8, 2026

বনদস্যুদের নৌকা প্রতি লাখ টাকা দিয়ে সুন্দরবনে ঢুকতে হচ্ছে জেলেদের

0
tiger-mtr89rzh5h7m6iy-20260907184425.jpg


বগুড়া নদী। বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার হুড়কা ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ও জনপদের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে নদীটি। নদীর তীরে নৌকায় একদল জেলে প্রস্তুতি নিচ্ছেন সুন্দরবনে যাওয়ার। চোখে অনিশ্চয়তার ছাপ। সুস্থ স্বাভাবিকভাবে ফিরতে পারবেন কি না তা নিয়ে সংশয়।

রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল ৫টায় বগুড়া নদীর তীরে কথা হয় এই জেলেদের সঙ্গে।

তারা জানান, বনদস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া বনে প্রবেশ ও নিরাপদে মাছ বা কাঁকড়া ধরা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বনদস্যুদের চাঁদা না দিলে অপহরণ করে নির্যাতন ও মুক্তিপণ দাবি করেন তারা। বনে প্রবেশ করতে নৌকা প্রতি ৫০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্তও দাবি করছে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চাঁদপাই, ঢাংমারী, ধানসাগর ও জিউধারা এই চারটি স্টেশনে এক হাজার ৯৫৩টি নৌযানের বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) রয়েছে। তবে গত ৭ দিনে জেলেরা ১০৯৯টি অনুমতিপত্র নিয়েছেন।

রামপাল উপজেলার বাঁশতলী ইউনিয়নের গিলাতলা গ্রামের জেলে লিটু শেখ বলেন, তিন মাস নিষেধাজ্ঞার সময়টি আমাদের খুব কষ্টে কাটে। এসময় অন্যের বাড়িতে ও মাঠে ঘাটে কাজ করে সংসার চলে। নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও এ বছর এখনো বনে যাইনি। বনদস্যুদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দিতে হবে। না দিলে তারা অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে। বনদস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা করে তাদের চাঁদা দিয়েই বনে প্রবেশ করতে হবে। অনেকেই ঝুঁকি নিয়ে বনে চলে গেছে। আমরাও যাব। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রামপাল এলাকার এক জেলে বলেন, আমাদের রুটি রুজি সব সুন্দরবনে। সুন্দরবনে অনেক সময় ডাকাতে ধরে নির্যাতন করে। মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেয়। অনেকেই সুন্দরবনে চলে গেছে। সুন্দরবনে কখন কী হয় কিছুই বলা যায় না। আমরাও ঝুঁকি নিয়ে যাচ্ছি। 

এক সময় সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়া বাগেরহাট সদর উপজেলার চুলকাঠি এলাকার এক জেলে কাসেদ মোড়ল বলেন, ‘পায়ের পাতা থেকে কোমর পর্যন্ত ডাকাতদের মাইরের দাগ। সারা বছর দিন রাত মাছ ধরে যা আয় করি ডাকাতে ধরলে তাদের তা দিয়ে দিতে হতো। একেকবার ধরে নিয়ে ট্রলার জালসহ ১০-১৫ দিন আটকে রাখতো। পরে মুক্তিপণ দিয়ে মুক্তি পেতে হতো। বছর শেষে আমাদের কোনো কিছুই থাকে না। তাই এখন আর যাই না।’

কচুয়ার বগি এলাকার মৎস্যজীবী নেতা ইব্রাহিম আমানি বলেন, জেলেদের বনে প্রবেশ করতে বনদস্যুদের চাঁদা দিতে হচ্ছে। বনদস্যুদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া বনে প্রবেশ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বনদস্যুদের চাঁদা না দিয়ে বনে যাওয়ায় কয়েকমাস আগে জেলেদের জনপ্রতি ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে ছাড়াতে হয়েছে।

শরণখোলা এলাকার মৎস্যজীবী নেতা হালিম খান বলেন, বনদস্যুরা চাঁদা বেশি দাবি করছে। আমার ৫টি নৌকা রয়েছে। কিছু নৌকা বনে গেছে, কিছু এখনো যায়নি। মাছ ধরতে বনে প্রবেশ করতে বনদস্যুদের ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকাও চাঁদা দিতে হচ্ছে। বনে প্রবেশ করতেই যদি বনদস্যুদের এত টাকা দেওয়া লাগে তাহলে আমরা বাঁচবো কীভাবে।

পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দীপন চন্দ্র দাস বলেন, কিছুদিন আগে ৪টি বনদস্যু বাহিনীর প্রধানসহ মোট ৫২ জন বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। যার কারণে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। তবে বর্তমানে বড় শরিফ বাহিনীর উৎপাত বেড়েছে। যার কারণে জেলেরা ভয়ে আছে। তাছাড়া বর্তমানে বৈরী আবহাওয়া ও নদীতে মরা জোয়ার থাকায় মাছ কম পাওয়া যাচ্ছে। এজন্য জেলেরা বনে কম যাচ্ছে। দুই একদিনের ভেতরই যাওয়া শুরু করবে। জেলেদের জীবন জীবিকা এই সুন্দরবনের ওপর। না গিয়েও উপায় নেই। 

পূর্ব সুন্দরবন বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বৈরী আবহাওয়া ও নদীতে মরা জোয়ার থাকায় অনেক জেলে এখনো সুন্দরবনে প্রবেশ করেননি।  কিছুদিন আগেও অনেক বনদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে। যার করে সুন্দরবনে বনদস্যু আতঙ্ক কমেছে। এছাড়া পর্যটক ও জেলেদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে সুন্দরবনের ক্যাম্প ও স্টেশনগুলোতে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো  পর্যটক ও জেলে যদি নিরাপত্তা চায় তাহলে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

নাহিদ ফরাজী/এফএ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *