প্রবীণদের সম্পত্তি দানের নতুন ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ও যুগোপযোগী
সন্তান, নাতি-নাতনি বা নিকটাত্মীয়কে সম্পত্তি দান করার পর ভোগ-দখল হারানোসহ নানা সমস্যায় পড়েন অনেক প্রবীণ। এমনকি সম্পত্তি পাওয়ার পর দানগ্রহীতা সেটি বিক্রি করে দেওয়া কিংবা দাতাকে নিজের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।
এ অবস্থায় প্রবীণ দাতাদের অধিকার সুরক্ষায় ‘ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দান’ ব্যবস্থাকে গুরুত্বপূর্ণ ও যুগোপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন নিবন্ধন সংশ্লিষ্টরা।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ সংশোধনের মাধ্যমে এ ধরনের দানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে কোনো ব্যক্তি জীবদ্দশায় সন্তান বা নিকটাত্মীয়ের কাছে সম্পত্তি দান করলেও দলিলে ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণের শর্ত থাকলে দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখল করতে পারবেন। সংশোধিত ব্যবস্থাটি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রযোজ্য হবে।
নিবন্ধন সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রচলিত হেবার ঘোষণাপত্র, দানের ঘোষণাপত্র ও দানপত্রের মাধ্যমে সম্পত্তি দানের পর দানগ্রহীতার মালিকানা সৃষ্টি হতে পারে। পরবর্তী সময়ে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তিনি নিজের নামে নামজারি করে সম্পত্তি হস্তান্তরও করতে পারেন। ফলে দানের পর দাতার নিজের বসবাস ও ভোগ-দখলের অধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়ার সুযোগ থাকে।
বাস্তবে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে বয়স্ক বাবা-মা সন্তানকে কিংবা দাদা-দাদি নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পর সমস্যায় পড়েছেন। সম্পত্তি পাওয়ার পর দানগ্রহীতা সেটি বিক্রি করে দিয়েছেন অথবা বৃদ্ধ দাতাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন। পরে দাতা দলিল বাতিলের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে গেলেও সেখানে প্রতিকার পাওয়া সম্ভব হয় না।
নিবন্ধন কর্মকর্তারা জানান, সাব-রেজিস্ট্রারের নিবন্ধিত দলিল বাতিল করার ক্ষমতা নেই। নিবন্ধন কর্মকর্তা আইন অনুযায়ী দলিল নিবন্ধন করতে পারেন; কিন্তু নিবন্ধিত দলিল বাতিলের বিষয়টি উপযুক্ত আদালতের এখতিয়ার। তাই সম্পত্তি দানের সময়ই দাতার ভোগ-দখলের অধিকার নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।
নতুন ব্যবস্থায় দাতা সম্পত্তি দান করলেও জীবদ্দশায় সেটি ব্যবহার ও ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। ফলে সম্পত্তি উত্তরাধিকারী বা পছন্দের ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের পাশাপাশি নিজের বসবাস ও ভোগের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করার সুযোগ থাকছে। সংশোধনের মূল উদ্দেশ্যও প্রবীণ ও অসহায় দাতাদের সুরক্ষা দেওয়া।
নিবন্ধন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ব্যবস্থা প্রচলিত সাধারণ দান, মুসলিম আইনের অধীন হেবা বা হেবার ঘোষণাপত্র কিংবা আইন দ্বারা স্বীকৃত অন্য কোনো সম্পত্তি হস্তান্তর পদ্ধতি বাতিল বা সীমিত করবে না। এসব ব্যবস্থা আগের মতোই বহাল থাকবে। নতুন পদ্ধতিটি হবে সম্পত্তি হস্তান্তরের আরেকটি স্বতন্ত্র সুযোগ।
মুসলিম ব্যক্তিগত আইনে নির্দিষ্ট সম্পর্কের ক্ষেত্রে হেবা বা হেবার ঘোষণাপত্রের প্রচলন রয়েছে। অন্যদিকে হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী দানের বিভিন্ন বিধান রয়েছে। নতুন ব্যবস্থাটি ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে সীমাবদ্ধ না থাকায় সব নাগরিকের জন্য একটি অতিরিক্ত আইনি সুরক্ষা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, জীবনের শেষ সময়ে সন্তান বা নিকটাত্মীয়ের ওপর নির্ভরশীল প্রবীণদের জন্য সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে দাতা সম্পত্তি হস্তান্তর করেও জীবদ্দশায় নিজের বসবাস ও ভোগের অধিকার ধরে রাখতে পারবেন।
এদিকে, বাংলাদেশ রেজিস্ট্রেশন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের (বিআরএসএ) পক্ষ থেকে এ ধরনের আইনগত পরিবর্তনের জন্য সরকারের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে।
সংগঠনটির মতে, সম্পত্তি দানের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাস্তব সমস্যা বিবেচনায় এ সংযোজন সময়োপযোগী, বাস্তবসম্মত ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
বিআরএসএ মহাসচিব মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ বলেন, বাস্তব জীবনে আমরা অনেক সময় দেখি, বাবা-মা বা বয়স্ক ব্যক্তিরা সন্তান কিংবা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দেওয়ার পর নিজেরাই সমস্যায় পড়ছেন। পরবর্তীতে দলিল বাতিলের জন্য তারা সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে আসেন। কিন্তু নিবন্ধন কর্মকর্তার নিবন্ধিত দলিল বাতিলের ক্ষমতা নেই। এ বাস্তবতায় ভোগ-দখলের অধিকার সংরক্ষণসহ দানের সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি এ ব্যবস্থাকে সময়পোযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেন।
এএএইচ/বিএ


