পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে ঝুঁকছে আবাসন-করপোরেট প্রতিষ্ঠান
একসময় পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের ধারণাটি মূলত তৈরি পোশাকশিল্পের কারখানায় সীমাবদ্ধ ছিল। এখন তা ছড়িয়ে পড়ছে আবাসন, করপোরেট প্রতিষ্ঠান, আর্থিক খাত, হাসপাতালসহ অর্থনীতির অন্য খাতেও।
আবাসন ব্যবসায়ী ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ভবন নির্মাণের নকশা বা বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং একটি ভবন কতটা জ্বালানি ও পানি সাশ্রয়ী, কর্মীদের জন্য কতটা স্বাস্থ্যকর এবং পরিবেশের ওপর তার প্রভাব কতটা কম- সে সব বিষয়কেও গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।
ফলে পরিবেশবান্ধব ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সনদপ্রাপ্ত ভবন এখন অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে শুধু স্থাপত্যের নতুন ধরন নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক কৌশল, করপোরেট দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার অংশ হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে পরিবেশগত দায়বদ্ধতার পাশাপাশি রয়েছে ব্যবসায়িক বাস্তবতাও। জ্বালানি ও পানির ব্যবহার কমিয়ে পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, কর্মীদের জন্য আরামদায়ক কর্মপরিবেশ তৈরি ও প্রতিষ্ঠানের টেকসই ভাবমূর্তি গড়ে তোলার বিষয়গুলোও সবুজ ভবনের প্রতি আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
পরিবেশবান্ধব ভবন/ছবি: জাগো নিউজ
বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ শুরু হয় তৈরি পোশাক শিল্পের হাত ধরে। একসময় শুধু তৈরি পোশাকশিল্পেই সবুজ কারখানা বা পরিবেশবান্ধব ভবনের ধারণা সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেটি কোনো একটি খাতের মধ্যে আটকে নেই। আবাসন, বাণিজ্যিক ভবন, ব্যাংক-বিমা, হাসপাতাল, করপোরেট কার্যালয়সহ বিভিন্ন খাতে পরিবেশবান্ধব ও সনদপ্রাপ্ত ভবনের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের (ইউএস জিবিসি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিভিন্ন খাতের প্রায় ৩৫টি সনদপ্রাপ্ত ভবন ও করপোরেট কার্যালয় রয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে বিশ্বের সর্বোচ্চ সংখ্যক এবং সর্বোচ্চ স্কোরধারী সবুজ কারখানা রয়েছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্লাটিনাম, সিলভার ও গোল্ড শ্রেণিতে মোট সনদপ্রাপ্ত কারখানা ২৯০টি।
কেন টেকসই নির্মাণে ঝুঁকছে আবাসন ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান?
বাংলাদেশে সবুজ ভবনের ধারণাটি দীর্ঘদিন মূলত তৈরি পোশাকশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল। বাণিজ্যিক ভবন বা আবাসন খাতে এর ব্যবহার খুব বেশি দেখা যেত না।
এখন পরিস্থিতি বদলেছে। পরিবেশের প্রতি যত্নবান হওয়া কিংবা সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে তাদের এ উদ্যোগ বলে জানান শিল্পসংশ্লিষ্টরা। সঙ্গে রয়েছে কর্মীদের সুস্বাস্থ্য ও নিজেদের ব্র্যান্ড ইমেজ।
সবুজ ভবনের উদ্যোগের পেছনে আমাদের দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে- ব্র্যান্ডের প্রতিশ্রুতি ও টেকসই উন্নয়নের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের কাজের মাধ্যমে একটি মানদণ্ড তৈরি করা।-শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও বিপণন বিভাগের প্রধান রাহি আফতাব
শান্তা হোল্ডিংস লিমিটেডের সহকারী মহাব্যবস্থাপক ও বিপণন বিভাগের প্রধান রাহি আফতাব জাগো নিউজকে বলেন, ‘সবুজ ভবনের উদ্যোগের পেছনে আমাদের দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে- ব্র্যান্ডের প্রতিশ্রুতি ও টেকসই উন্নয়নের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিল নিজেদের কাজের মাধ্যমে একটি মানদণ্ড তৈরি করা।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি শান্তা হোল্ডিংস দেশের প্রথম ৪০ তলা প্লাটিনাম সনদপ্রাপ্ত বাণিজ্যিক ভবন ‘শান্তা পিনাকল’-এর নির্মাণ শেষ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির আরও কয়েকটি প্রকল্প নির্মাণাধীন। সেগুলোও পরিবেশবান্ধব ভবন হিসেবে সনদ নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।’
টেকসই নগরায়ণের বিষয়টি মাথায় রেখে এবং পরিবেশের সঙ্গে উন্নয়নের সমন্বয় ঘটাতেই শান্তা হোল্ডিংস পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণের দিকে এগিয়েছে বলে জানান রাহি আফতাব।
শুধু নগরায়ণ বা শিল্পায়ন নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণও জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
একাধিক সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণকারী আবাসন প্রতিষ্ঠান ইনস্টার লিমিটেডের পরিচালক এসএনআর তৌফিক জাগো নিউজকে জানান, তাদের মূল লক্ষ্য শুধু সবুজ ভবনের সনদ পাওয়া বা ব্যবসা নয়, বরং এটি পরিবেশের প্রতি সামাজিক দায়িত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গির অংশ।
একটি ভবন নির্মাণের সময় গাছ কাটা হয়। নির্মাণকাজের কারণে বিভিন্ন ধরনের দূষণ সৃষ্টি হয়। পরিবেশবান্ধব ও সনদপ্রাপ্ত ভবনের মাধ্যমে অন্তত কিছুটা হলেও সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।-আবাসন প্রতিষ্ঠান ইনস্টার লিমিটেডের পরিচালক এসএনআর তৌফিক
তিনি বলেন, ‘আমরা এই দেশেরই সন্তান। এই শহরের বাসিন্দা। ব্যবসার মাধ্যমে যদি পরিবেশের জন্য সামান্য কিছু করতে পারি এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথ তৈরি করতে পারি, তাহলে সেটিই আমাদের দায়িত্ব।’
কার্বন নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাপ কমানোও দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।
তৌফিক বলেন, ‘একটি ভবন নির্মাণের সময় গাছ কাটা হয়। নির্মাণকাজের কারণে বিভিন্ন ধরনের দূষণ সৃষ্টি হয়। পরিবেশবান্ধব ও সনদপ্রাপ্ত ভবনের মাধ্যমে অন্তত কিছুটা হলেও সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।’
নদীকে দূষণ থেকে রক্ষা করতে হবে এবং কৃষিজমির যাতে ক্ষতি না হয় সেদিকেও নজর দিতে হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি শুধু পরিবেশ আইন ও বিধিবিধান মেনে চলার বিষয় নয়, বরং একটি ভালো পৃথিবী গড়ে তোলার সামাজিক দায়িত্ব।’
কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা
পরিবেশবান্ধব অফিস স্পেস কিংবা ভবন নির্মাণে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অবশ্য পরিবেশের পাশাপাশি কর্মীদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে।
পরিবেশগত দায়িত্বশীলতা ও ব্যবসায়িক কার্যকারিতা যে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, সেটিই একটি বিশ্বমানের সদর দপ্তরের মাধ্যমে দেখানো ছিল তাদের লক্ষ্য।-এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক তানজিল চৌধুরী
এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসির পরিচালক তানজিল চৌধুরী বলেন, ‘মবিল হাউজের পরিকল্পনার সময় আমাদের লক্ষ্য শুধু একটি করপোরেট সদর দপ্তর নির্মাণ করা ছিল না। আমরা এমন একটি কর্মপরিবেশ তৈরি করতে চেয়েছি, যা এমজেএল বাংলাদেশ পিএলসির টেকসই উন্নয়ন, কার্যকর পরিচালনা, কর্মীদের কল্যাণ ও দায়িত্বশীল করপোরেট নাগরিকত্বের প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করবে।’
মবিল হাউজ এমজেএলের সদর দপ্তর ও ভবনটি ইউএস জিবিসির প্লাটিনাম সনদ অর্জন করে। বর্তমানে এটি বাংলাদেশের অন্যতম টেকসই করপোরেট কার্যালয় ভবন।
তানজিল চৌধুরী বলেন, ‘এ ভবন নির্মাণের পিছনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো একটি স্বাস্থ্যকর ও অধিক উৎপাদনশীল কর্মপরিবেশ তৈরি করা।’
করপোরেট কার্যালয়গুলোকেও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব কমাতে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করা উচিত বলে মনে করেন তিনি।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানজিল আরও বলেন, ‘পরিবেশগত দায়িত্বশীলতা ও ব্যবসায়িক কার্যকারিতা যে একই সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব, সেটিই একটি বিশ্বমানের সদর দপ্তরের মাধ্যমে দেখানো ছিল তাদের লক্ষ্য।’
বাংলাদেশে সবুজ ভবনের ধারণা সাধারণত উৎপাদন ও তৈরি পোশাক খাতের সঙ্গে যুক্ত। তবে এই ধারণার বাইরে গিয়ে করপোরেট কার্যালয়েও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব- এটি দেখিয়েছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড।
ইউবিএলের উদ্যোগের পেছনে ছিল একটি স্পষ্ট লক্ষ্য- টেকসই উন্নয়নকে এককালীন অর্জন হিসেবে না দেখে প্রতিদিনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা। করপোরেট কার্যালয়টি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে সম্পদের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি কর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণে উৎসাহ দেওয়া যায়।-ইউনিলিভার বাংলাদেশের মানবসম্পদ পরিচালক সৈয়দা দুরদানা কবির
ইউনিলিভার বাংলাদেশের মানবসম্পদ পরিচালক সৈয়দা দুরদানা কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের কাছ থেকে ইউনিলিভার বাংলাদেশের করপোরেট কার্যালয় গোল্ডেন সনদ অর্জন করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ইউবিএলের উদ্যোগের পেছনে ছিল একটি স্পষ্ট লক্ষ্য- টেকসই উন্নয়নকে এককালীন অর্জন হিসেবে না দেখে প্রতিদিনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা। করপোরেট কার্যালয়টি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে, যাতে সম্পদের ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি কর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণে উৎসাহ দেওয়া যায়।’
নির্মাণব্যয় বেশি, সুফল দীর্ঘমেয়াদি
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, প্রচলিত ভবনের তুলনায় সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে সাধারণত ১০ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি ব্যয় হয়। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ও সর্বাধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহারের কারণে প্রাথমিক বিনিয়োগ বাড়ে।
ইনস্টার লিমিটেডের পরিচালক তৌফিক বলেন, ‘সত্যি বলতে, এ ধরনের প্রকল্প বেশ ব্যয়বহুল। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বাণিজ্যিকভাবে কার্যকর রাখা। প্রচলিত নির্মাণের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি ব্যয় হয়। তাই টেকসই উন্নয়ন ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতার মধ্যে ভারসাম্য রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
পরিবেশবান্ধব ভবন/ছবি: জাগো নিউজ
তার মতে, স্থানীয় ও বিদেশি পরামর্শক ফি, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, নিয়মনীতি মেনে চলা এবং পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে প্রয়োজনীয় সবশেষ প্রযুক্তি সংগ্রহের অতিরিক্ত মূলধন- সব মিলিয়ে ব্যয় বাড়ে।
তানজিল চৌধুরী বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে প্রচলিত ভবনের তুলনায় প্রাথমিক বিনিয়োগ সাধারণত ৫ থেকে ১০ শতাংশ বেশি হতে পারে।’
রাহি আফতাবও বলেন, ‘সবশেষ ও বিশেষায়িত প্রযুক্তি ব্যবহারের কারণে ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও গ্রাহকদের বিষয়টি বোঝানো হলে তারা ইতিবাচকভাবে সাড়া দেন।’
তবে বেশি বিনিয়োগের বিপরীতে নির্মাতারা সাধারণত ক্রেতার কাছ থেকে সরাসরি অতিরিক্ত অর্থ পান না। বরং কম জ্বালানি ব্যবহার, উন্নত কর্মপরিবেশ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের কাছে ভবনের গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা পাওয়া যায় বলে জানান তিনি।
তৌফিক বলেন, ‘আমাদের বিনিয়োগের বিনিময়ে মূলত যে সুবিধাটি পাওয়া যায়, তা হলো গ্রাহকের পছন্দ ও অগ্রাধিকার। কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান জায়গা ভাড়া বা কেনার জন্য খুঁজলে তারা সাধারণত নিয়ম-নীতি মেনে নির্মিত ও পরিবেশবান্ধব ভবনকে অগ্রাধিকার দেয়। এটি আমাদের বিক্রির অন্যতম বড় জায়গা।’
তবে বাণিজ্যিক কার্যকারিতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ ক্রেতারা সাধারণত এ ধরনের ভবনের জন্য অতিরিক্ত মূল্য দিতে আগ্রহী নন বলে মন্তব্য তার।
কীভাবে কমছে কার্বন নিঃসরণ
পরিবেশবান্ধব ভবনে বিদ্যুৎ ও পানির ব্যবহার কমানোর জন্য বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তানজিল চৌধুরী বলেন, ‘উচ্চ দক্ষতার শীতলীকরণ ব্যবস্থা, তাপ ও শব্দ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম দ্বিস্তরীয় কাচের বহিরাবরণ, ভবনে মানুষের উপস্থিতি ও দিনের আলোর ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত সংবেদক, বুদ্ধিমান আলোক নিয়ন্ত্রণ এবং ভবনের উপযুক্ত দিকনির্দেশনা ও ছায়া ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে প্রচলিত অফিস ভবনের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব।’
পাশাপাশি পানি পুনর্ব্যবহার, পানি সাশ্রয়ী সরঞ্জাম ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পানির ব্যবহার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যায় বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন এখনো অনেকাংশে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। ফলে এক ইউনিট বিদ্যুৎ সাশ্রয় মানেই সরাসরি কার্বন নিঃসরণ কমানো।’
প্রাকৃতিক আলো সর্বোচ্চ ব্যবহার করে দিনের বেলায় কৃত্রিম আলোর প্রয়োজন কমানো হচ্ছে। সংবেদকভিত্তিক আলো ও পানি ব্যবস্থাপনা অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমায়। ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে কার্যকর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও অফিস সময় শেষে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বন্ধ রাখার মতো কঠোর ব্যবস্থাপনা জ্বালানি দক্ষতা আরও বাড়াচ্ছে।
শান্তা হোল্ডিংসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এর বাস্তব ফলও পাওয়া গেছে। ২০২৪ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অফিসটির বিদ্যুৎ ব্যবহার ১৬ শতাংশ কমেছে। ফলে প্রচলিত অফিসের তুলনায় কার্বন নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
রাহি আফতাব বলেন, ‘সনদপ্রাপ্ত ভবনে উচ্চ দক্ষতার শীতলীকরণ প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব শীতলীকরণ গ্যাস ব্যবহার করা হয়েছে, যা ওজোন স্তরের জন্য ক্ষতিকর নয়। বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে ভবনে সংবেদকভিত্তিক আলোকব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। কোনো স্থানে মানুষ না থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতি বন্ধ হয়ে যায় এবং মানুষ উপস্থিত হলে তা জ্বলে ওঠে। এসব বাতি এলইডি প্রযুক্তিনির্ভর।’
এ ছাড়া স্মার্ট লিফট করা হয়েছে, যা প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচালিত হয় এবং তুলনামূলকভাবে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে। ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে, যা মোট বিদ্যুৎ চাহিদার একটি অংশ পূরণ করে বলে জানান তিনি।
রাহি আফতাব বলেন, ‘এর ফলে কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে কমছে।’
ইনস্টার লিমিটেডের তৌফিক বলেন, ‘ভবনে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি ব্যবহৃত হয় শীতলীকরণ ব্যবস্থায়, বিশেষ করে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণে। তাই আধুনিক ও জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ও ভবন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।’
প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে পানির ওপর চাপ কমাতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ব্যবহৃত পানি পুনর্ব্যবহার, পরিশোধনের পর পানি পুনরায় ব্যবহার এবং পয়ঃনিষ্কাশন পরিশোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে।
তার মতে, এসব ছোট ছোট উদ্যোগ একত্রে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমায়, তাপ উৎপাদন ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ওপর চাপ কমায়। ফলে সামগ্রিক জ্বালানি দক্ষতা বাড়ে এবং কার্বন নিঃসরণ কমে।
করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষ্য, যদিও গ্রিন বিল্ডিং নির্মাণের প্রাথমিক ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল এই অতিরিক্ত ব্যয় পুষিয়ে দেয়। এসব ভবনে কম বিদ্যুৎ খরচ হয়, প্রাকৃতিক সম্পদ যেমন দিনের আলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হয় এবং পানি পুনর্ব্যবহার ও পুনঃব্যবহার করা হয়। ফলে ভবনের পরিচালন ব্যয় কমে যায় ও দীর্ঘমেয়াদে এই বিনিয়োগ লাভজনক হয়ে ওঠে।
সামনে করণীয় কী
পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা, জলবায়ু ও স্থানীয় উপকরণকে বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব একটি সবুজ ভবন মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সজল চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যেতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের মানদণ্ড মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু, নির্মাণ উপকরণ ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই বাংলাদেশের নিজস্ব জলবায়ু ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করে এই মানদণ্ড কতটা উপযোগী, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।-চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সজল চৌধুরী
বিশ্বে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব ভবনের জন্য বিভিন্ন সনদ ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত হলো জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব নকশায় নেতৃত্ব বা লিড। এই ব্যবস্থায় ভবনকে সিলভার, গোল্ড ও প্লাটিনামসহ বিভিন্ন শ্রেণিতে সনদ দেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশের নিজস্ব কোনো সবুজ ভবন সনদ বা মূল্যায়ন ব্যবস্থা নেই। ফলে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অনেকটাই যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
অধ্যাপক সজল চৌধুরী বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের মানদণ্ড মূলত যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু, নির্মাণ উপকরণ ও পরিবেশের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তাই বাংলাদেশের নিজস্ব জলবায়ু ও পরিবেশের কথা বিবেচনা করে এই মানদণ্ড কতটা উপযোগী, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।’
তার মতে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি, স্থানীয় নির্মাণ উপকরণ ও জলবায়ুর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজস্ব সবুজ ভবন মূল্যায়ন ব্যবস্থা তৈরি করা প্রয়োজন।
এ খাতের উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণে সরকারি নীতি সহায়তা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আমদানিতে কর কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, টেকসই উন্নয়নে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবুজ অর্থায়ন ব্যবস্থা থাকলেও এর প্রক্রিয়া বেশ জটিল। অন্যদিকে, নির্মাণকাজে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে শুল্কও তুলনামূলক বেশি।
এ কারণে পরিবেশবান্ধব নির্মাণখাতকে উৎসাহিত করতে এসব যন্ত্রপাতি ও প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি শুল্ক কমানো এবং সহজ অর্থায়ন নিশ্চিত করার দাবি জানান তারা।
আইএইচও/এএসএ




