September 12, 2026

দোকান খুলে ক্রেতার অপেক্ষা, ক্রেতা আসার সময় হলেই বিদ্যুৎ উধাও

0
untitled-design-2-20260912210126.jpg


সারাদিন দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতার দেখা নেই। বিকেলের পর যখন কিছুটা বেচাকেনা শুরু হয়, তখনই হানা দেয় লোডশেডিং। দেড় থেকে দুই ঘণ্টা, কখনো তারও বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সন্ধ্যার গুরুত্বপূর্ণ বিক্রির সময়টুকুও কাজে লাগাতে পারছেন না রাজশাহীর ব্যবসায়ীরা।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনে চার-পাঁচবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল, দোকানভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও ট্যাক্সের চাপ। আবার বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য রাত ৮টার পর দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে ক্রেতা সংকট ও বাড়তি ব্যয়ের চাপে লোকসান গুনছেন তারা।

রাজশাহীর সাহেববাজার, আরডিএ মার্কেট ও নিউ মার্কেটের বিভিন্ন পোশাকের দোকান ঘুরে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, একসময় ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর থাকা আরডিএ মার্কেটের পোশাকের দোকানগুলোতে এখন তেমন ভিড় নেই। অধিকাংশ দোকান খোলা থাকলেও অনেক বিক্রেতাকে অলস সময় কাটাতে দেখা যায়। পোশাকের পাশাপাশি জুতা, গহনা, প্রসাধনী, শিশুদের খেলনা ও গৃহস্থালি পণ্যের দোকানেও ক্রেতার উপস্থিতি তুলনামূলক কম।

jagonews24

ব্যবসায়ীরা জানান, সারাদিন দোকান খোলা রাখলেও হাতেগোনা কয়েকজন ক্রেতা আসছেন। অনেকে পণ্য দেখছেন, দাম করছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত না কিনেই চলে যাচ্ছেন। ফলে দৈনিক বিক্রিও কমে গেছে। তবে বিভিন্ন উৎসব বা বিশেষ মৌসুমে বেচাকেনা কিছুটা বাড়ে।

উৎস কালেকশনের মালিক হাবিব বলেন, মাসের শুরুতেই ব্যবসার অবস্থা ভয়াবহ। কাস্টমার একদম নেই বললেই চলে। এত বড় প্রতিষ্ঠান নিয়ে বসে আছি, কিন্তু কোনো ব্যবসা হচ্ছে না। প্রতিদিন প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা লোকসান বা ঘাটতি গুনতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ধরে রাখা কঠিন হয়ে যাবে।

লোডশেডিংয়ের বিষয়ে তিনি বলেন, যেটুকু সময় কাস্টমার পাওয়া যায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার দিকে, তখনই বিদ্যুতের সমস্যা দেখা দেয়। কারেন্ট চলে গেলে এক থেকে দেড় ঘণ্টা, কখনো দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। দিনে চার-পাঁচবারও বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এভাবে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে ব্যবসা কীভাবে চলবে?

তিনি আরও বলেন, আগে রাত ১০টা-১১টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখতেন। এখন সরকার নির্ধারিত সময় অনুযায়ী রাত ৮টার দিকে দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসার সময় কমে গেছে। ব্যবসার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের কিস্তি টানাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিক্রি কম, বাড়ছে লোকসান

আরডিএ মার্কেটের লুক কালেকশনের মালিক মো. শামীম বলেন, গত তিন-চার মাস ধরে বর্ষা-বৃষ্টি ও আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। দোকানের বিদ্যুৎ বিল, ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতনসহ নিয়মিত খরচ মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। নিজস্ব পুঁজি শেষ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়ছেন তারা।

তিনি বলেন, রাজশাহী মহানগরে ফুটপাতের দোকান ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে মাসের পাঁচ তারিখের পর ফুটপাতের ব্যবসা আরও জমজমাট হয়। ফলে মানুষ মার্কেটের পরিবর্তে ফুটপাতমুখী হচ্ছেন। অনেক সময় ৫০০ টাকার পণ্য ৩০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে ব্যবসার পুঁজি ধরে রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

শামীম আরও বলেন, দোকানের ট্যাক্স ও বিদ্যুৎ বিল বাড়লেও সে অনুপাতে ব্যবসা বাড়েনি। কোনো দিন ১০ হাজার টাকা, আবার কোনো দিন ৫ হাজার বা ৩ হাজার টাকা বিক্রি হয়। অনেক দিন কোনো বিক্রিই হয় না। অথচ প্রতিদিন একটি দোকানের পেছনে প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলে প্রতিদিনই ঘাটতি থাকছে। গড়ে ৩ হাজার টাকা লোকসান হলে মাসে প্রায় ৯০ হাজার টাকা ঘাটতি হয়। অনেক সময় মাসে এক লাখ টাকার কাছাকাছিও লোকসান হচ্ছে।

ফুটপাতের ব্যবসা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য ফুটপাতের ব্যবসার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এটি নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে আনার পাশাপাশি মার্কেটের ব্যবসায়ীদেরও টিকে থাকার সুযোগ তৈরি করতে হবে।

jagonews24

নিউ মার্কেটের পোশাক বিক্রেতা আসাদুল ইসলাম বলেন, আগের মতো এখন ক্রেতা পাওয়া যায় না। অনেকেই মার্কেটে না এসে ফুটপাত থেকে কম দামে পোশাক কিনছেন। ফলে বেচাকেনা অনেকটাই কমে গেছে।

সাহেববাজারের জুতা ব্যবসায়ী আমজাদ বলেন, বেচাকেনা একদম ডাউন। এ বাজারে আমাদের তিনটি দোকান। সবগুলোতেই বিক্রির অবস্থা ভালো না। দিনভর তেমন ক্রেতা থাকে না। তবে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কিছুটা বেচাকেনা হয়। এভাবে চলতে থাকলে লোকসানের মধ্যে পড়তে হবে।

অনলাইনেও কমছে শোরুমের বিক্রি

মার্কেটের পাশাপাশি রাজশাহীর বিভিন্ন শোরুমেও ক্রেতার উপস্থিতি কম দেখা গেছে। বিক্রয়কর্মীরা জানান, অনলাইনভিত্তিক কেনাকাটার জনপ্রিয়তার কারণেও শোরুমের বেচাকেনায় ভাটা পড়েছে।

ইজি ফ্যাশনের বিক্রয়কর্মী নাবিল মোস্তফা বলেন, আলহামদুলিল্লাহ, এখানে বেচাকেনা মোটামুটি আছে। তবে আগে যে পরিমাণে সেল হতো, এখন তেমন সেল নেই। অনেকেই অনলাইনে পোশাক অর্ডার করছেন। ফলে আমাদের বেচাকেনায়ও ভাটা পড়ছে।

বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক দোকানে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে ডিজেলের বাড়তি খরচে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।

বিক্রেতা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, অতিরিক্ত লোডশেডিংয়ের কারণে দোকানে জেনারেটর লাগিয়েছেন। কিন্তু ডিজেলের দামের কারণে আয়-ব্যয়ের হিসাব মিলছে না। তারপরও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করছেন।

পরিকল্পিত রেশনিং হতে পারে স্বল্পমেয়াদি সমাধান

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহা. ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, ব্যবসায়ীরা বর্তমানে সবচেয়ে খারাপ সময়ের মধ্যে রয়েছেন। বিপ্লবের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ভালো ছিল না। অস্থিরতার কারণে ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে, কিন্তু মানুষের আয়-উপার্জন সেভাবে বাড়েনি। এর সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সংকট। অনেক মার্কেটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা ও পর্যাপ্ত আলোর সুবিধা ছাড়া মানুষ যেতে চায় না।

অধ্যাপক ফরিদ উদ্দীন খান বলেন, স্বল্পমেয়াদে ব্যবসায়ীদের জন্য নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যেতে পারে। কোন এলাকায় কখন বিদ্যুৎ থাকবে বা থাকবে না, তা আগে থেকে জানিয়ে দিলে ব্যবসায়ীরা প্রস্তুতি নিতে পারবেন। এ ধরনের পরিকল্পিত রেশনিং কিছুটা কার্যকর হতে পারে। তবে এটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ছোট ছোট উদ্যোক্তারা অল্প পুঁজি নিয়ে ব্যবসা করছেন এবং অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তারা ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলে দেশের অর্থনীতিতে এর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

এমওএইচএম/কেএইচকে



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *