‘থানায় এসে জানতে পারি তাদের পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে’
যশোরের চৌগাছায় গ্রেফতারের পর ‘বন্দুকযুদ্ধ’ সাজিয়ে ছাত্রশিবিরের দুই নেতাকে গুলি করার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষীর জবানবন্দি পেশ করেছেন এক পুলিশ সদস্য।
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্যানেলে জবানবন্দি পেশ করেন তিনি।
এদিন রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর আবদুস সাত্তার পালোয়ান। সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম, মার্জিনা রায়হান, তাসমিরুল ইসলাম ও মঈনুল করিমসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর।
মামলায় আট আসামি হলেন, তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান, চৌগাছা থানার তৎকালীন ওসি মশিউর রহমান, এসআই মোখলেছ, এসআই জামাল ও এসআই মাজেদুল, তৎকালীন উপপরিদর্শক আতিকুল ইসলাম, তৎকালীন কনস্টেবল সাজ্জাদুর রহমান ও কনস্টেবল জহরুল হক। এর মধ্যে আতিকুল ইসলাম, সাজ্জাদুর রহমান ও জহরুল হক গ্রেফতার রয়েছেন।
রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেওয়া ওই এএসআই বর্তমানে সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা থানায় কর্মরত। ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ পর্যন্ত চৌগাছা থানায় কর্মরত ছিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।
দুই নেতা হলেন, যশোর জেলা পশ্চিম চৌগাছা উপজেলার ২০১৬ সালের সাহিত্য সম্পাদক মো. রুহুল আমিন ও থানা সেক্রেটারি ইস্রাফিল হোসেন।
অভিযোগে বলা হয়, ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট সাংগঠনিক কাজ শেষ করে রুহুল আমিন বাড়ি যাওয়ার পথে বন্দুলিতলা শফি মল্লিকের ইটভাটার মোড় থেকে চৌগাছা থানার একজন এসআই এবং দুজন এএসআই তাদের গ্রেফতার করে চৌগাছা থানায় নিয়ে যায়। ৪ আগস্ট তাদের ডিবি কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সারাদিন জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাদের আবার চৌগাছা থানায় নিয়ে আসার পথে কয়ারপাড়া এলাকায় এলে দুজনকেই হাতকড়া পরানো হয় এবং চোখ বেঁধে ফেলা হয়।
গভীর রাতে তাদের নিয়ে যাওয়া হয় বন্দুলিতলার নির্জন মাঠে। সেখানে নিয়ে দুজনের হাঁটুতে পুলিশ গুলি করে পা ঝাঝরা করে দেয়। সেখান থেকে তাদের উপজেলা সরকারি হাসপাতলে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতেই তাদের রেফার করা হয় যশোর সদর হাসপাতালে। সেখানে দুদিন চিকিৎসার পর কোনো উন্নতি না হওয়ায় তাদের ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভর্তি হওয়ার সাতদিন পর পায়ে পচন ধরলে চিকিৎসক পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত দেয় এবং পা কেটে ফেলা হয়।
এরমধ্যে বিভিন্ন মিডিয়াতে প্রচার করা হয়, ‘বন্দুকযুদ্ধে’ দুই শিবির নেতা আহত। তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলা করে দুই মাস চিকিৎসার পর পাঠিয়ে দেওয়া হয় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে।
জবানবন্দিতে পাটকেলঘাটা থানায় ওই এএসআই বলেন, ২০১৬ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত আমি এএসআই হিসেবে যশোর জেলার চৌগাছা থানায় কর্মরত ছিলাম। ওই বছরের ৩ আগস্ট দুপুরে বিশেষ অভিযান পরিচালনার উদ্দেশে আমি, এএসআই মুখলেছুজ্জামান, এএসআই আকিক, এএসআই মাজেদ ও সঙ্গীয় ফোর্সসহ চৌগাছা থানাধীন নারায়ণপুর ফাঁকা রাস্তায় চেকপোস্ট করি। তখন একটি মোটরসাইকেলে দুজন ব্যক্তিকে আসতে দেখি। আমরা তাদের মোটরসাইকেল থামাই। তাদের সঙ্গে একটি শপিং ব্যাগে ইসলামী ছাত্র শিবিরের চাঁদা আদায়ের রসিদ এবং রেজিস্টার দেখতে পাই। জিজ্ঞাসাবাদে তারা তাদের নাম ইসরাফিল ও রুহুল আমীন বলে জানায়।
তখন আমাদের সঙ্গে থাকা এএসআই মুখলেছুজ্জামান মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বিষয়টি চৌগাছা থানার ওসিকে জানান। ওসি স্যার তাদের নিয়ে থানায় আসতে বলেন। তাদের থানায় নিয়ে এসে ডিউটি অফিসারের রুমে রেখে আমি বাসায় চলে যাই।
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, দুদিন পর ৫ আগস্ট থানায় এসে জানতে পারি যাদের আমরা গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে এসেছিলাম ৪ আগস্ট রাত দশটা থেকে সাড়ে দশটার দিকে চৌগাছা থানাধীন বন্দুলিতলা নামক স্থানে তাদের পায়ে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে তাদের বিরুদ্ধে দুটি সাজানো মিথ্যা মামলা দায়ের করে। ওই গুলিগুলো করে সাজ্জাদ ও জহিরুল। এএসআই মুখলেছুজ্জামান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন।
তিনি বলেন, ওই মামলায় আমাকে সঙ্গীয় অফিসার হিসেবে আহত দেখানো হয় এবং বলা হয় যে, আমি চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা গ্রহণ করেছি। ওই ঘটনায় আমি আদৌ আহত হইনি। ওই মামলায় প্রদর্শিত ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম। এ বিষয়ে আমি এএসআই মুখলেছুজ্জামানকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ওসি আনিসুর রহমান এবং ওসি মশিউর রহমান সব বিষয়ে অবগত আছেন, আমি যেন নীরব থাকি। পরবর্তীতে এসআই জামাল ওই মামলায় আমাকে সাক্ষী হিসেবে দেখিয়ে মামলার চার্জশিট দাখিল করেন।
এফএইচ/এমকেআর
