September 1, 2026

তরুণ কর্মীদের জন্য খাতভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন, এক নীতিতে সমাধান নয়

0
badol-20251029100103.jpg


দেশের তরুণ কর্মীদের জন্য একক নীতির পরিবর্তে খাতভিত্তিক সহায়তা প্রয়োজন বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, তরুণদের জন্য নগদ সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তাই বেশি প্রয়োজন। বিপরীতে, স্থানান্তর ভাতা বা ব্যবসা শুরুর মূলধনের প্রতি তাদের আগ্রহ তুলনামূলক কম।

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ ও আলোচনা অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)।

গবেষণায় বলা হয়, একজন তরুণ কোথায় কাজ করেন ও কোথায় বসবাস করেন—তার ওপর নির্ভর করে তিনি কতটা নিরাপদ ও স্থিতিশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। তৈরি পোশাক (আরএমজি), কৃষি ও নির্মাণ খাতের তরুণ কর্মীদের নিরাপদ ও স্থায়ী চাকরির সম্ভাবনা পরিবহন খাতের কর্মীদের তুলনায় বেশি। এর মধ্যে আরএমজি খাতের কর্মীদের অবস্থান সবচেয়ে ভালো হলেও এ খাতেও কর্মীদের একটি বড় অংশ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও বন্যার মতো জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা এলাকায় বসবাস করলে লিঙ্গ বা কর্মখাত নির্বিশেষে তরুণদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা কমে যায়।

গবেষণায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে অবদান ০ দশমিক ৫ শতাংশেরও কম হলেও দেশটি গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্সে সপ্তম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতি এখনো কার্বননির্ভর ও জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ খাতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।

দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে প্রায় ৪০ লাখ মানুষ কাজ করেন ও মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এ খাত থেকে। অন্যদিকে কৃষি খাত দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪১ শতাংশকে কর্মসংস্থান দেয়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ও অর্থনীতির রূপান্তরের প্রভাব এসব খাতের তরুণ কর্মীদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির কারণে আরএমজি খাতে যতটা কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা করা হয়, বাস্তবে এখন পর্যন্ত তা তুলনামূলক কম। তবে নির্মাণ খাতের কর্মীদের মজুরি ও কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনাজনিত সুরক্ষা প্রায় নেই বললেই চলে।

এছাড়া দেশের অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের নির্ভরযোগ্য কোনো জাতীয় ডেটাবেজ নেই। ফলে জলবায়ু পরিবর্তন ও ‘জাস্ট ট্রানজিশন’ এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের চিহ্নিত করে সঠিকভাবে সহায়তা দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের তথ্যঘাটতি রয়েছে।

তরুণ কর্মীদের অগ্রাধিকারের বিষয়েও খাতভেদে পার্থক্য পাওয়া গেছে। নির্মাণ খাতের কর্মীরা নগদ সহায়তাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আরএমজি ও পরিবহন খাতের কর্মীরা চাকরি খুঁজে পেতে সহায়তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কৃষি খাতের কর্মীরা নগদ সহায়তা ও প্রশিক্ষণ—দুটিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

গবেষণায় তরুণ কর্মীদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থার ক্ষেত্রেও পার্থক্য দেখা গেছে। কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে সরকারের ওপর আস্থা বেশি। আরএমজি ও নির্মাণ খাতের কর্মীরা নিয়োগদাতাদের ওপর বেশি নির্ভরশীল। অন্যদিকে পরিবহন খাতের কর্মীদের মধ্যে ইউনিয়নের ওপর আস্থা তুলনামূলক বেশি।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের জন্য একই ধরনের জাতীয় কর্মসূচির পরিবর্তে খাত ও এলাকার প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

অনুষ্ঠানে সানেমের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর জুবায়ের হোসেন বলেন, ‘তরুণরা এই রূপান্তরের ঝুঁকিতে তুলনামূলক বেশি থাকলেও বাংলাদেশকে আরও টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তারাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। এ কারণেই তাদের কেন্দ্র করে এই গবেষণার তথ্যভিত্তি তৈরি করা হয়েছে।’

সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, ‘জাস্ট ট্রানজিশন এখন বৈশ্বিক ও জাতীয়—দুই পর্যায়েই গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ খাতের ওপর নির্ভরতার কারণে এ আলোচনায় দেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

সানেমের গবেষণা অর্থনীতিবিদ ফারহান খান বলেন, ‘একটি সমাধান দিয়ে সব খাতের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়। কোন খাতের তরুণ কর্মীদের কী প্রয়োজন, তা খাতভেদে আলাদা। তাই তাদের জন্য নেওয়া কর্মসূচি তৈরির সময় তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অর্থবহভাবে যুক্ত করতে হবে।’

গবেষণাটি উপকূলীয়, নদীভাঙনপ্রবণ ও শহরাঞ্চলসহ দেশের নয়টি জেলার ৬২৫ জন তরুণ কর্মীর ওপর পরিচালিত হয়। এতে মাঠপর্যায়ের ও অনলাইন জরিপের পাশাপাশি ১৪টি মূল তথ্যদাতা সাক্ষাৎকার এবং অংশগ্রহণমূলক কর্মশালা করা হয়। বাংলাদেশের বিভিন্ন জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বৈচিত্র্য বিবেচনায় নিয়ে গবেষণার নমুনা নির্বাচন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সরকারি কর্মকর্তা, নিয়োগদাতা সংগঠন ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা গবেষণার ফলাফল নিয়ে আলোচনা করেন। তারা উদীয়মান ও সংকুচিত হয়ে আসা কর্মসংস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জাতীয় পর্যায়ে দক্ষতা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা করার ওপর গুরুত্ব দেন।

একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক শ্রমিকদের সরকারি তথ্যভাণ্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা, ভবিষ্যৎ গবেষণায় পলিটেকনিক শিক্ষার্থী এবং পেশাগতভাবে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করারও দাবি ওঠে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বকারী অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, ‘বাস্তব কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত না থাকলে শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে কোনো সমাধান হবে না। এমন কারিগরি প্রশিক্ষণ প্রয়োজন, যা নিয়োগদাতাদের বাস্তব চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক ও নির্মাণ খাতের কর্মীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা বাড়াতে হবে এবং তরুণদের এই রূপান্তরের পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।’

ইএইচটি/এমএমকে



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *