খলিফা ওমরের (রা.) জনমুখী শাসনের গল্প
খলিফার কাঁধে আটার বস্তা
দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমরের (রা.) একটি অভ্যাস ছিল রাতের বেলা ঘুরে ঘুরে জনগণের অবস্থা দেখা। এক রাতে তিনি ও তার গোলাম আসলাম হাঁটতে হাঁটতে মদিনার মূল শহরের বাইরে পাথুরে ভূমির দিকে এগিয়ে গেলে এক জায়গায় আগুন জ্বলতে দেখলেন। ওমর (রা.) তার গোলাম আসলামকে বললেন, ‘মনে হয় ওখানে মানুষ আছে। তাদের রাতটা নিশ্চয় ভালো কাটছে না। চলো, দেখে আসি।’
তারা সেখানে গিয়ে দেখলেন এক নারী আগুন জ্বালিয়ে তার ওপর পাতিল বসিয়েছে। তার পাশে কয়েকটি শিশু কাঁদছে। ওমর (রা.) মহিলাকে সালাম দিলেন। মহিলা সালামের জওয়াব দিলেন। ওমর (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনাদের কী অবস্থা?’
নারী বললেন, ‘রাতে অনেক শীত পড়েছে। ঠাণ্ডায় কষ্ট পাচ্ছি।’
ওমর (রা.) জানতে চাইলেন, ‘আপনার বাচ্চারা কেমন আছে, তারা কাঁদছে কেন?’
নারী বললেন, ‘তারা ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে।’
ওমর (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘পাতিলে কী রান্না করছেন?’
নারী বললেন, ‘কিছুই না। শুধু পানি। আমি বাচ্চাদের সান্ত্বনা দিচ্ছি, তারা যেন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। ওমর ও আমাদের মাঝে কেবল আল্লাহই আছেন।’ অর্থাৎ তিনি আশায় ছিলেন আল্লাহ যেন তার সংবাদ খলিফা ওমর (রা.) পর্যন্ত পৌঁছে দেন, তাহলে খলিফা নিশ্চয় কোনো ব্যবস্থা করবেন। তিনি জানতেন না, তিনি যার সাথে কথা বলছেন তিনিই খলিফা।
নারীর কথা শুনে হজরত ওমর (রা.) কেঁদে ফেললেন। তিনি সাথে সাথে খেলাফতের খাদ্যগুদামের দিকে দিকে রওয়ানা দিলেন। তারপর এক বস্তা আটা ও এক পাত্র ঘি নিয়ে আসলামকে বললেন, ‘এগুলো আমার পিঠে তুলে দাও।’
আসলাম বললেন, ‘আমাকে দিন, আমিই এসব বহন করি।’
ওমর (রা.) বললেন, ‘তুমি কি কেয়ামতের দিন আমার বোঝা বহন করবে?’ এরপর নিজেই তা পিঠে নিলেন।
তারা দুজনে সেই নারীর কাছে গেলেন। ওমর (রা.) নিজেই রান্না শুরু করলেন। চুলায় আগুন নিভে গেলে তিনি ফুঁ দিয়ে আগুন ধরান, এতে তার দাড়িতে কালি লেগে যায়। রান্না শেষ হলে তিনি নিজেই থালায় বেড়ে বাচ্চাদের খাওয়ান। সবাই তৃপ্তি সহকারে খায়। নারীর যা যা প্রয়োজন, খলিফা সব ব্যবস্থা করে দেন। তারপর বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে তিনি ফিরে আসেন। মহিলা তখনও জানেন না, তার কুটিরে আসা ব্যক্তিটি আর কেউ নন, মুসলিম জাহানের পরাক্রমশালী খলিফা হজরত ওমর (রা.)। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ২৪৯ পৃষ্ঠা, ইফাবা)
‘আপনি পরবর্তী খলিফাদের জন্য দায়িত্ব পালন কঠিন করছেন’
একদিন হজরত আলী (রা.) দেখলেন, খলিফা ওমর (রা.) খুব তাড়াহুড়া করে কোথাও যাচ্ছেন। আলী (রা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আমিরুল মুমেনিন, কোথায় যাচ্ছেন?’
ওমর (রা.) বললেন, ‘জাকাতের উট থেকে একটি উট পালিয়ে গেছে। আমি ওটাকে খুঁজছি।’
আলী (রা.) বললেন, ‘আপনি পরবর্তী খলিফাদের জন্য দায়িত্ব পালন কঠিন করে দিচ্ছেন!’
অর্থাৎ ওমর (রা.) যেভাবে খলিফার দায়িত্ব পালন করেছেন, জাকাতের উট খোঁজার জন্য নিজেই ছুটছেন, তাতে তার পরে যারা খলিফা হবেন তাদেরও তার আদর্শ অনুসরণ করে এভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়, সেটা তাদের জন্য কঠিন হবে। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৭ম খণ্ড, ২৪৯ পৃষ্ঠা, ইফাবা)
জনগণ যা খেতে পায় না খলিফাও খাবেন না
হযরত ওমরের (রা.) খেলাফতকালে একবার মদিনায় খাদ্যের সংকট দেখা দেয়। সেই সময় একদিন ওমর (রা.) খাবার খাচ্ছিলেন। তার দস্তরখানে ছিল রুটি আর ঘি। এ সময় অনেক দূরের মরুভূমি থেকে এক লোক তার সাথে দেখা করতে এলো। তিনি তাকে খেতে ডাকলেন। গ্রাম্য লোকটি গপগপ করে রুটি আর ঘি খেতে লাগল। তার খাওয়া দেখে ওমর (রা.) বললেন, ‘মনে হচ্ছে আপনি খুবই অভাবে আছেন।’
লোকটি বলল, ‘অনেকদিন হয় আমি ঘি খাইনি, আর কাউকে ঘি খেতেও দেখিনি।’
হজরত ওমর (রা.) তার কথা শুনে বললেন, ‘যতদিন না মানুষের আর্থিক অবস্থা আগের মতো স্বাভাবিক হয়, ততদিন আমি ঘি খাব না। (মুয়াত্তায়ে মালেক, সিফাতুন নবী অধ্যায়, হাদিস নং ১৭৩৪)
ওএফএফ


