‘ক্যানসার আক্রান্ত’ ১৩ জীবন বিমা কোম্পানি
দেশের জীবন বিমা খাতে সামগ্রিকভাবে বেড়েছে ব্যবসা। তবে ১৩টি কোম্পানির আর্থিক চিত্রে দেখা যাচ্ছে উদ্বেগজনক অবনতি। ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা ও জীবন তহবিল দুই ক্ষেত্রেই সংকোচন হয়েছে।
দীর্ঘ সময় ধরে ব্যবসার পাশাপাশি জীবন তহবিল কমার এ চিত্রকে ‘ক্যানসার আক্রান্ত’ বলছেন জীবন বিমা বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, কোনো কোম্পানির ব্যবসা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকা এবং একই সঙ্গে জীবন তহবিল কমে যাওয়া ভালো লক্ষণ নয়। এ ধরনের পরিস্থিতি অনেকটা শরীরে ক্যানসার বাসা বাঁধার মতো। শুরুতেই রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা করা না হলে তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একইভাবে বিমা কোম্পানিগুলোর সমস্যাও দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা না নিলে এর নেতিবাচক প্রভাব পুরো বিমা খাতে পড়বে।
ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা ও জীবন তহবিল কমে যাওয়ার তালিকায় সমস্যাগ্রস্ত ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, গোল্ডেন লাইফ ও বায়রা লাইফের পাশাপাশি মেঘনা লাইফ, পপুলার লাইফ, রূপালী লাইফ ও প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো কোম্পানিও রয়েছে। এ তালিকায় আরও আছে- হোমল্যান্ড লাইফ, সানফ্লাওয়ার লাইফ, সান লাইফ, প্রগ্রেসিভ লাইফ ও প্রটেক্টিভ লাইফ।
ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমার কারণ হিসেবে কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে- বিগত দিনে কিছু জীবন বিমা কোম্পানি থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। ফলে কয়েকটি কোম্পানি গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা ঠিকমতো পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে এ খাতে এক ধরনের ইমেজ সংকট তৈরি হয়েছে। যে কারণে মানুষ বিমা করতে আগ্রহী হচ্ছেন না।
পাশাপাশি সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে কমেছে ব্যবসা। তবে ব্যবসা কমলেও কোম্পানিগুলোকে গ্রাহকের বিমা দাবির টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে, তাই কমেছে লাইফ ফান্ড বা জীবন তহবিল।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালে দেশে ব্যবসা করা জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত ব্যবসা ছিল ৯ হাজার ৫২৮ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ১০২ কোটি টাকা। অর্থাৎ, সামগ্রিকভাবে এ খাতের ব্যবসা বেড়েছে তিন হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধির বিপরীতে বেশ কয়েকটি কোম্পানি পিছিয়ে পড়েছে।
মেঘনা লাইফ
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, ব্যবসায় বড় ধরনের পতন হয়েছে মেঘনা লাইফের। ২০২০ সালে মেঘনা লাইফের মোট প্রিমিয়াম আয় বা ব্যবসা ছিল ৪২২ কোটি টাকা। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে ২৮৩ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ, ছয় বছরের ব্যবধানে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসা কমেছে ১৩৯ কোটি টাকা।
ব্যবসার পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির জীবন তহবিলেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির জীবন তহবিল ছিল ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকা। ২০২৫ সাল শেষে তা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা। অর্থাৎ, জীবন তহবিল কমেছে ৩২০ কোটি টাকা।
পপুলার লাইফ
ব্যবসা ও জীবন তহবিলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পপুলার লাইফেরও। ২০২০ সালে পপুলার লাইফের ব্যবসা ছিল ৫৯১ কোটি টাকা। এরপর ২০২৩ সালে কোম্পানিটি ৬৭৭ কোটি টাকার ব্যবসা করলেও ২০২৫ সালে তা কমে হয় ৫০১ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই বছরের ব্যবধানে ১৭৬ কোটি এবং ছয় বছরের ব্যবধানে ৯০ কোটি টাকা ব্যবসা কমেছে কোম্পানিটির।
একই সময়ে কোম্পানিটির জীবন তহবিলেও বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। ২০২০ কোম্পানিটির জীবন তহবিল ছিল ১ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা। সেখান থেকে কমে ২০২৫ সাল শেষে ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ ছয় বছরে জীবন তহবিল কমেছে ২৬০ কোটি টাকা।
ফারইস্ট লাইফ
সমস্যাগ্রস্ত ফারইস্ট লাইফের ব্যবসায় বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ৯৭৪ কোটি টাকা। সেখান থেকে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ২৮৩ কোটি টাকা। কোম্পানিটির জীবন তহবিল ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির জীবন তহবিল ছিল ২ হাজার ৩ কোটি টাকা, যা কমে ঋণাত্মক ৮৪৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
প্রাইম লাইফ
প্রাইম লাইফের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ৪১৪ কোটি টাকা, সেখান থেকে ২০২৫ সালে ৩৮৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। অর্থাৎ, ছয় বছরে ব্যবসা কমেছে ২৬ কোটি টাকা। আর জীবন তহবিল ৮৩৭ কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ৭৪৪ কোটি টাকায়।
রূপালী লাইফ
২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ২৪৮ কোটি টাকা। সেখান থেকে কমে ২০২৫ সালে ব্যবসা হয়েছে ২১৫ কোটি টাকা। ব্যবসা কমলেও কোম্পানিটির জীবন তহবিল একই জায়গায় রয়েছে। ২০২০ সালে জীবন তহবিল ছিল ৫০৫ কোটি টাকা, ২০২৫ সালেও রয়েছে তাই।
সানফ্লাওয়ার লাইফ
২০২০ সালে সানফ্লাওয়ার লাইফের ব্যবসা ছিল ৬৫ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে মাত্র ১৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, ছয় বছরে ব্যবসা কমেছে ৫০ কোটি টাকা। জীবন তহবিলেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ১৩৮ কোটি টাকা থেকে জীবন তহবিল কমে দাঁড়িয়েছে ৮৮ কোটি টাকায়।
হোমল্যান্ড লাইফ
হোমল্যান্ড লাইফের ব্যবসায় ভয়াবহ ধস নেমেছে। ২০২০ সালে কোম্পানিটির ব্যবসা ছিল ১০১ কোটি টাকা। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে ২০২৫ সালে মাত্র ৯ কোটি টাকা হয়েছে। অর্থাৎ, ছয় বছরে ব্যবসা কমেছে ৯২ কোটি টাকা। একই সময়ে জীবন তহবিলও ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়েছে। কোম্পানিাটির জীবন তহবিল ২৬১ কোটি টাকা থেকে কমে ১৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
গোল্ডেন লাইফ
গোল্ডেন লাইফের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ২৪ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে নেমেছে ১৭ কোটি টাকায়। আর জীবন তহবিল ২০২০ সালে ছিল ২৬১ কোটি টাকা, সেখান থেকে কমে ১৬৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
পদ্মা লাইফ
পদ্মা লাইফের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ৪৯ কোটি টাকা। ২০২৫ সালে তা কমে ১৫ কোটি টাকা হয়েছে। আর জীবন তহবিল ১৩ কোটি টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ৩০৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, কোম্পানিটির পক্ষে এখন টিকে থাকাই কঠিন।
নতুন ও ছোট কোম্পানিতেও সংকট
বায়রা লাইফের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ৪ কোটি টাকা। সেখান থেকে ২০২৫ সালে কমে ২ কোটি টাকায় নেমেছে। জীবন তহবিল ৬৬ কোটি টাকা থেকে কমে ঋণাত্মক ৬৫ কোটি টাকা হয়েছে। সান লাইফের ব্যবসা ১০৫ কোটি টাকা থেকে কমে ১৯ কোটিতে নেমেছে। আর ১৮২ কোটি টাকার জীবন তহবিল কমে দাঁড়িয়েছে ৪৯ কোটি টাকায়।
প্রগ্রেসিভ লাইফের ব্যবসা ৪২ কোটি টাকা থেকে কমে ৩০ কোটি টাকায় কমেছে। প্রতিষ্ঠানটির জীবন তহবিল ২৭৩ কোটি টাকা থেকে কমে ৬৯ কোটি টাকায় চলে এসেছে। অর্থাৎ, ছয় বছরের ব্যবধানে জীবন তহবিল কমেছে ২০৪ কোটি টাকা।
নতুন প্রজন্মের জীবন বিমা কোম্পানি প্রটেকটিভ লাইফের ব্যবসা ৩৯ কোটি টাকা থেকে কমে ৩১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর জীবন তহবিল ১০ কোটি টাকা থেকে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ কোটি টাকায়। এ অবস্থা চলতে থাকলে সামনে কোম্পানিটি গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধ করতে পারবে না।
ব্যবসার পাশাপাশি জীবন তহবিল কমে যাওয়ায় কোম্পানিগুলোর জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। কারণ বিমা কোম্পানির জন্য শুধু নতুন ব্যবসা অর্জন নয়, জীবন তহবিল ধরে রাখাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জীবন তহবিলের সঙ্গে পলিসিধারীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ ও কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতার সম্পর্ক রয়েছে।
আছে ভালো ব্যবসারও নজির
অবশ্য পুরো জীবন বিমা খাত সংকটে রয়েছে- এমন চিত্রও পাওয়া যাচ্ছে না। একই সময়ে ন্যাশনাল লাইফ, ডেল্টা লাইফ, জীবন বীমা করপোরেশন, প্রগতি লাইফ, সোনালী লাইফ, গার্ডিয়ান লাইফসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা বেড়েছে।
ন্যাশনাল লাইফের ব্যবসা ২০২০ সালে ছিল ১ হাজার ২০১ কোটি টাকা। সেখান থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ২ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। ডেল্টা লাইফের ব্যবসা ৭৩২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ১৯ কোটি টাকা হয়েছে। জীবন বীমা করপোরেশনের ব্যবসা ৬০১ কোটি টাকা থেকে ৯৭৬ কোটি টাকা, প্রগতি লাইফের ব্যবসা ৩১৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৬৬৭ কোটি টাকা হয়েছে।
একইভাবে মেটলাইফের ব্যবসা ২ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা থেকে ৩ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, সন্ধানী লাইফের ১৮৬ কোটি টাকা থেকে ২৪৭ কোটি টাকা, সোনালী লাইফের ১৩৫ কোটি টাকা থেকে ৮৬৬ কোটি টাকা, গার্ডিয়ান লাইফের ২৮৩ কোটি টাকা থেকে ৮৮৬ কোটি টাকা এবং জেনিথ লাইফের ১৫ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৪৭ কোটি টাকা হয়েছে।
জীবন বিমা কোম্পানির ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড ধারাবাহিকভাবে বাড়বে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। সেখানে যদি ধারাবাহিকভাবে কোনো কোম্পানির ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমতে থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে ওই কোম্পানিগুলো ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে।-প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম
অর্থাৎ, একই বাজারে কিছু প্রতিষ্ঠান যখন ব্যবসা সম্প্রসারণ করছে, তখন অন্য কিছু কোম্পানি ব্যবসা ও জীবন তহবিল দুই দিক থেকেই পিছিয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে প্রগতি লাইফের সিইও মো. জালালুল আজিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘জীবন বিমা কোম্পানির ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড ধারাবাহিকভাবে বাড়বে এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। সেখানে যদি ধারাবাহিকভাবে কোনো কোম্পানির ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমতে থাকে তাহলে বুঝে নিতে হবে ওই কোম্পানিগুলো ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘ব্যবসা কমার অর্থ কোম্পানিগুলো সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না এবং গ্রাহকরা কোম্পানিগুলোর ওপর আস্থা পাচ্ছেন না। এটার কারণ হতে পারে কোম্পানিগুলো গ্রাহকের বিমা দাবি সঠিকভাবে দিচ্ছে না। সঠিকভাবে দাবি পরিশোধ করলে গ্রাহকদের আস্থা হারানোর কথা নয়। ধারাবাহিকভাবে ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমলে কোম্পানিগুলোর দাবি পরিশোধের সক্ষমতা সামনে আরও কমে যাবে।’
এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম হতে পারে। এখন প্রতিষ্ঠানগুলোর সমস্যা প্রকাশ্যে আসছে। ক্যানসার আক্রান্ত এই কোম্পানিগুলোর দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগে, দাবি পরিশোধে নাকি অন্য কোনো জায়গায় সমস্যা আছে, তা খুঁজে বের করে সমাধান করতে হবে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কোম্পানিগুলোকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।’
প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসা কমার পিছনে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কোনো ভূমিকা আছে কি না? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কারণে যদি ব্যবসা কমতো, তাহলে সব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায় তার প্রতিফলন থাকতো। কিন্তু কিছু কোম্পানির ব্যবসা তো ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। সুতরাং, যে কোম্পানিগুলো ব্যবসা পাচ্ছে না, সেটা অর্থনৈতিক পরিস্থিতির জন্য নয়, তাদের নিজস্ব সমস্যার কারণে ব্যবসা পাচ্ছে না।’
জীবন তহবিল মূলত পলিসি হোল্ডারদের অর্থ। নতুন ব্যবসা ও রিনিউয়াল কমে গেলেও গ্রাহকদের পুরোনো পলিসির টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে জীবন তহবিল থেকে অর্থ বের হয়ে গেছে এবং তহবিল কমেছে।-মেঘনা লাইফের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন
মেঘনা লাইফের চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জীবন বিমা কোম্পানিগুলো যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। শুরুর দিকে জীবন বিমা কোম্পানিগুলোর প্রতি সরকার, মালিকপক্ষ কিংবা ব্যবস্থাপনা কোনো পক্ষই যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।’
তিনি বলেন, ‘জীবন বিমা ব্যবসার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো গ্রাহকের কাছ থেকে যে টাকা নেওয়া হয়, তার বড় অংশ ১০, ১২ কিংবা ১৫ বছর পর পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে অনেক কোম্পানি শুরুতে গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার পর ভবিষ্যতের দায়ের কথা যথাযথভাবে বিবেচনায় না নিয়ে অতিরিক্ত ব্যয় করেছে। কোম্পানি শুরু হওয়ার পরই অনেকে অফিস-দালান করেছে, গাড়ি কিনেছে, নানা খাতে খরচ করেছে। কেউ ২০-২৫টি গাড়ি কিনেছে, কেউ ৪০০-৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প করেছে। কিন্তু যখন পলিসির টাকা পরিশোধের সময় এসেছে, তখন দেখা গেছে প্রয়োজনীয় অর্থ নেই।’
দেশের পরিস্থিতি ভালো না, মানুষ বিমা করতে চায় না। আমাদের ব্যবসা কমার কারণ আগে যারা ছিল তারা লুটপাট করে চলে গেছে। আমরা এখন গ্রাহকদের টাকা ঠিকমতো দিতে পারছি না। আগে যে লুটপাট হয়েছে, তার ফল এখন আমরা ভোগ করছি। ৮০০-৯০০ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে।-প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আকতার
তিনি আরও বলেন, ‘এ ধরনের অনিয়ম ও অপরিকল্পিত ব্যয়ের কারণে অনেক জীবন বিমা কোম্পানি এখন আর্থিক চাপে পড়েছে। গত ১৫ বছরেও জীবন বিমা খাতের এসব বিষয়ে যথাযথ নজরদারি ছিল না। এমনকি রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেক কোম্পানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।’
মেঘনা লাইফের ব্যবসা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গে নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘ব্যবসা কমার পেছনে শুধু কোম্পানির দুর্বলতা দায়ী নয়, বরং অতীতে প্রচলিত কিছু অনিয়মিত ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়াও এর অন্যতম কারণ। আগে কম্পিউটারাইজড ব্যবস্থা ছিল না। এখন হিসাব-নিকাশসহ বিভিন্ন কার্যক্রম প্রযুক্তিনির্ভর ও নিয়মতান্ত্রিক হওয়ায় অতীতে যেসব অননুমোদিত বা অনিয়মিত ব্যবসা হতো, সেগুলো অনেকটাই বন্ধ হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘মেঘনা লাইফের প্রায় ৪শ থেকে ৫শ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংকে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে পদ্মা ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকে অর্থ আটকে আছে। ব্যাংকে আটকে থাকার কারণে প্রয়োজনের সময় এই অর্থ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এছাড়া বিভিন্ন লিজিং কোম্পানিতেও অর্থ আটকে রয়েছে। তুলনামূলক বেশি মুনাফার আশায় কিছু অর্থ লিজিং কোম্পানিতে রাখা হয়েছিল। পরবর্তীসময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সংকটের কারণে সেই অর্থও আটকে গেছে।’
জীবন তহবিল কমে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করে মেঘনা লাইফের চেয়ারম্যান বলেন, ‘জীবন তহবিল মূলত পলিসি হোল্ডারদের অর্থ। নতুন ব্যবসা ও রিনিউয়াল কমে গেলেও গ্রাহকদের পুরোনো পলিসির টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। ফলে জীবন তহবিল থেকে অর্থ বের হয়ে গেছে এবং তহবিল কমেছে।’
নিজাম উদ্দিন দাবি করেন, ‘মেঘনা লাইফ ইন্স্যুরেন্স গ্রাহকদের পাওনা পরিশোধ করছে। তবে বিভিন্ন ব্যাংকে বিপুল অর্থ আটকে থাকায় কোম্পানিকে কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে।’
ব্যবসা ও লাইফ ফান্ড কমার কারণ হিসেবে প্রাইম ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আকতার জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের পরিস্থিতি ভালো না, মানুষ বিমা করতে চায় না। আমাদের ব্যবসা কমার কারণ আগে যারা ছিল তারা লুটপাট করে চলে গেছে। আমরা এখন গ্রাহকদের টাকা ঠিকমতো দিতে পারছি না। আগে যে লুটপাট হয়েছে, তার ফল এখন আমরা ভোগ করছি। ৮০০-৯০০ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে।’
এমএএস/এএসএ





