September 14, 2026

এক শিক্ষার্থীর জন্য প্রতিদিন ৫ কিলোমিটার হাঁটেন শিক্ষক

0
6aa790163331f17893662946aa7901633321.jpg



প্রতিদিন সময়মতো বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে অনেক শিক্ষকই বাড়ি থেকে বের হন ভোরে। কেউ যান গাড়িতে, কেউ গণপরিবহনে। তবে ৫৫ বছর বয়সী জীবন মিথারির গল্পটা একেবারেই আলাদা। একজন শিক্ষার্থীকে পড়াতে প্রতিদিন তাকে পাড়ি দিতে হয় দুর্গম পাহাড়ি পথ, হাঁটতে হয় প্রায় ৫ কিলোমিটার।

ভারতের মহারাষ্ট্রের কোলহাপুর জেলার গগনবাওয়াড়া তালুকের প্রত্যন্ত কাওয়ালটেক ধাঙ্গারওয়াড়া জেলা পরিষদ বিদ্যালয়ে গত ১৩ বছর ধরে শিক্ষকতা করছেন জীবন মিথারি। বিদ্যালয়টি কোলহাপুর-সিন্ধুদুর্গ সীমান্তের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত।

বিদ্যালয়ে যাওয়ার জন্য সেখানে নেই কোনো ভালো সড়ক কিংবা যানবাহনের ব্যবস্থা। নিকটতম সড়ক থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় আড়াই কিলোমিটার। ফলে প্রতিদিন যেতে আড়াই এবং ফিরতে আরও আড়াই কিলোমিটার—মোট প্রায় ৫ কিলোমিটার পথ হেঁটেই যাতায়াত করতে হয় তাকে।

পথটিও মোটেই সহজ নয়। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হয় মিথারিকে। বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টি ও বন্যার পাশাপাশি পথে থাকে বন্য প্রাণীর ঝুঁকি। তবু এসব বাধা পেরিয়েই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে পৌঁছান তিনি।

মিথারি বলেন, ‘২০১৩ সালের ২৬ জুলাই এখানে যোগ দিয়েছিলাম। এরপর থেকে এখানেই কাজ করে যাচ্ছি।’

একসময় এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশ ভালোই ছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে জীবিকার সন্ধানে অনেক পরিবার কোলহাপুর শহরে চলে যায়। এতে গ্রামের জনসংখ্যা কমার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সংখ্যাও কমতে থাকে।

বর্তমানে বিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী স্বরা বোদা ছাড়া আর কেউ নেই। স্বরার ছোট বোনও বিদ্যালয়ে ক্লাস করে, তবে সে এখনো নিবন্ধিত শিক্ষার্থী নয়।

এমন প্রত্যন্ত এলাকায় পোস্টিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত মিথারির জন্য সহজ ছিল না। এর আগে তিনি কোলহাপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমবায় ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সহকর্মীদের অনেকে তাকে তুলনামূলক আরামদায়ক কর্মস্থল বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

কিন্তু মিথারি ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেন। দুর্গম বিদ্যালয়টিতে পোস্টিং নেওয়ার সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নিয়েছিলেন। তার কাছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কখনোই বড় বিষয় হয়ে ওঠেনি।

মিথারির ভাষায়, ‘একজন শিশুই যদি থাকে, তবু আমাকে আমার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।’

প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথও তার জন্য কম ঝুঁকিপূর্ণ নয়। ওই এলাকায় গাউর ও চিতাবাঘের মতো বন্য প্রাণীর বিচরণ রয়েছে। একাধিকবার পথ চলতে গিয়ে গাউরের মুখোমুখিও হয়েছেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে কীভাবে সতর্ক থাকতে হবে, তা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছ থেকেই শিখেছেন।

এ ছাড়া গবাদিপশুর ওপর হামলার পর গ্রামের কাছাকাছি এলাকায় একটি চিতাবাঘকেও দেখা গেছে। ফলে প্রতিদিনের পথচলায় ভয় কাজ করলেও দায়িত্ব থেকে পিছিয়ে যাননি মিথারি।

তিনি স্বীকার করেন, কখনো কখনো ভয় লাগে। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই পথ পাড়ি দিতে দিতে তা এখন তার জীবনেরই অংশ হয়ে গেছে।

জীবন মিথারির কাছে শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি দায়িত্বও। প্রত্যন্ত এলাকার কোনো শিশু যেন শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়, সেটিই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই একজন শিক্ষার্থীকে পড়াতে প্রতিদিন প্রায় ৫ কিলোমিটার দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যান ৫৫ বছর বয়সী এই শিক্ষক।

আমার বাঙলা/ রাব্বি



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *