আসল শত্রুকে চিনুন, ঐক্যবদ্ধ হোন: মুসলিম দেশগুলোকে খামেনির আহ্বান
মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের প্রতি তাদের ‘আসল শত্রুকে’ চিহ্নিত করে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি। হরমুজ প্রণালি কেন্দ্র করে অব্যাহত তীব্র উত্তেজনার মধ্যেই তেহরান যখন নিজেদের কঠোর অবস্থানে অনড় রয়েছে, ঠিক তখনই এ অঞ্চলের মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো নতুন করে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদার করেছে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে রোববার (৩০ আগস্ট) প্রকাশিত এক বিশেষ বার্তায় মোজতবা খামেনি বলেন, ইসলামি দেশগুলো, বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শাসকদের প্রতি আমার জোরালো ও বারবার আহ্বান- আপনারা আপনাদের আসল শত্রুকে চিনুন, তার চক্রান্ত বুঝুন ও তাকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিহত করুন।
উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকে মোজতবা খামেনি আর জনসম্মুখে আসেননি। এই বার্তার মাধ্যমেই তার স্পষ্ট অবস্থান আবারও সামনে এলো।
সর্বোচ্চ নেতার এই বার্তাটি এমন এক সময়ে এলো যখন বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ নিয়ে চলমান অচলাবস্থা কাটেনি। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালী দিয়েই পরিবাহিত হতো।
শনিবার (২৯ আগস্ট) ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি জানান, অস্থায়ী সামুদ্রিক রুট চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। তবে এটি বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র গত জুন মাসের মাঝামাঝিতে স্বাক্ষরিত মধ্যবর্তী সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করে কি না তার ওপর।
গারিবাবাদি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, হরমুজ প্রণালি আপাতত সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই প্রণালি অতিক্রম করতে চাওয়া যে কোনো জাহাজকে অবশ্যই ইরানের সঙ্গে আগে থেকে সমন্বয় করতে হবে। সমঝোতা বাস্তবায়নের জন্য অন্য পক্ষকে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রতিশ্রুতি বজায় রাখতে হবে। তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেই কেবল ইরান প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
বর্তমানে ইরান ও ওমান যৌথভাবে একটি অস্থায়ী জাহাজ চলাচল করিডোর তৈরি এবং মাইন অপসারণ নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, কাতার ও পাকিস্তান তাদের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করেছে। পরিস্থিতি শান্ত করতে ও হরমুজ দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) তেহরান সফর করেন কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান বিন জসিম আল থানি।
কূটনৈতিক আলোচনার মধ্যেও হরমুজ দিয়ে পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল তলানিতে ঠেকেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ‘কেপলার’-এর উপাত্ত উদ্ধৃত করে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মাত্র ৭টি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে, যা তার আগের দিনের ১৭টি ও গত ১০ দিনের গড় ১৫টির তুলনায় অনেক কম।
ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশন (আইএমও) শুক্রবার (২৮ আগস্ট) জানিয়েছে, মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রায় ৪০০টি জাহাজ ও সেখানে থাকা প্রায় ৬ হাজার নাবিক নিরাপদে পারস্য উপসাগর ত্যাগ করতে পারছেন না। আইএমও-এর মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গুয়েজ প্রণালিটিতে মুক্ত জাহাজ চলাচল ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার আকুল আবেদন জানিয়েছেন।
কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি তেহরানের ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপও প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ইরানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৬ শতাংশে। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ-অবরোধের কারণে দেশের মোট আমদানি-রপ্তানি প্রায় ৩৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এর পাশাপাশি ওয়াশিংটন ইরান-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরও সম্প্রসারিত করেছে ও তেহরানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগে সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মিশরের ‘ব্যাংক মিশর’-এর শাখাগুলোর ডলার লেনদেনে বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
এত সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ সত্ত্বেও হরমুজ ইস্যুতে নতিস্বীকারের কোনো লক্ষণ দেখায়নি তেহরান। তবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জুনের সেই মধ্যবর্তী চুক্তিটি পুনরায় জীবিত করার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, এই সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো সমাধান করতে পারি ও অধিকারগুলো অর্জন করতে পারি।
সূত্র: আল-জাজিরা
এসএএইচ
