September 1, 2026

আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির ক্যারিয়ারের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো

0
messi1-20260901221248.jpg


দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনার জার্সিতে একের পর এক ইতিহাস লিখেছেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ জয়, কোপা আমেরিকার শিরোপা, অলিম্পিক সোনা কিংবা ব্যক্তিগত রেকর্ড- আর্জেন্টিনার হয়ে তার ক্যারিয়ারে জমা হয়েছে অসংখ্য স্মরণীয় অধ্যায়।

২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হারের পর আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন মেসি। নিজের হাতে লেখা একটি নোটের ছবি ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করে তিনি জানান, ফাইনালের দুইদিন পরই অবসরের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ৮ আগস্ট বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পরও সেই সিদ্ধান্ত আরও দৃঢ় হয়।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০০৫ সালে অভিষেক থেকে শুরু করে ২০২৬ বিশ্বকাপ- দীর্ঘ এই যাত্রায় মেসি শুধু একজন ফুটবলার ছিলেন না, হয়ে উঠেছিলেন পুরো একটি প্রজন্মের আবেগ। তার সেই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত-

২০০৫: অভিষেকেই লাল কার্ড

১৭ আগস্ট ২০০৫। বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ দিয়ে আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে অভিষেক মেসির। বয়স তখন মাত্র ১৮। কিন্তু অভিষেকটা মোটেও স্বপ্নের মতো হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে মাঠে নামার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সরাসরি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে।

Messi

জাতীয় দলের হয়ে পথচলার শুরুটা হয়েছিল হতাশায়; কিন্তু পরবর্তী দুই দশকে সেই লাল কার্ডকে মুছে দিয়ে মেসি লিখেছেন অসাধারণ এক গল্প।

২০০৬: প্রথম বিশ্বকাপ, প্রথম গোল

এক বছর পরই বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির আগমন। ২০০৬ সালের ১৬ জুন সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে গ্রুপ ম্যাচে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ১৮ বছর বয়সী মেসি। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোল। সঙ্গে একটি অ্যাসিস্টও করেন তিনি। আর্জেন্টিনা ম্যাচটি জেতে ৬-০ গোলে। সেদিন থেকেই বিশ্বকাপের মঞ্চে মেসির দীর্ঘ যাত্রার শুরু।

২০১০: ম্যারাডোনার অধীনে বিশ্বকাপ

২০১০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার কোচ ছিলেন আরেক কিংবদন্তি- দিয়েগো ম্যারাডোনা। একদিকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়, অন্যদিকে তার উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত তরুণ মেসি- দুজনকে একই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ডাগআউট ও মাঠে দেখা ছিল বিশেষ এক মুহূর্ত।

যদিও মাঠের ফলাফল আর্জেন্টিনার পক্ষে সুখকর হয়নি। কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে বিদায় নেয় তারা। তবু মেসি-ম্যারাডোনার সেই যুগলবন্দি আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাসে বিশেষ জায়গা করে নেয়।

২০১৪: ফাইনালে হার, হাতে গোল্ডেন বল

২০১৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলেন মেসি। ব্রাজিলের আসরে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন তিনি। জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালও ছিল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে মারিও গোটশের গোলে শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনা।

তবে পুরো টুর্নামেন্টে অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে মেসির হাতে ওঠে গোল্ডেন বল। সাত ম্যাচে তার গোল ছিল চারটি, অ্যাসিস্ট একটি। সেই হারের পর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন আরও গভীর হয়ে ওঠে মেসির।

২০১৬: কোপা হারের পর অবসরের ঘোষণা

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তগুলোর একটি আসে ২০১৬ সালে। কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। ম্যাচে মেসি পেনাল্টি মিস করেন। টানা কয়েকটি বড় ফাইনালে ব্যর্থতার হতাশায় ম্যাচের পরই জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন তিনি।

তখন মেসি বলেছিলেন, জাতীয় দলের হয়ে শিরোপা জেতার জন্য তিনি সবকিছু করেছেন। কিন্তু চারটি ফাইনালে গিয়েও সফল হতে না পারার হতাশা তাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

তবে সেই অবসর স্থায়ী হয়নি। আর্জেন্টিনার হয়ে ফিরে আসেন তিনি। আর সেই প্রত্যাবর্তনের পরই শুরু হয় তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সফল আন্তর্জাতিক অধ্যায়।

২০২১: অবশেষে কোপা আমেরিকা জয়

২০১৬ সালের সেই কান্না থেকে ২০২১ সালের আনন্দ- মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে বদলে যায় মেসির আন্তর্জাতিক গল্প। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে ফাইনালে স্বাগতিকদের ১-০ গোলে হারিয়ে কোপা আমেরিকার শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা।

Messi

২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটে। আর মেসির হাতে ওঠে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি। ছয় বছর আগে যে কোপা আমেরিকার হার তাকে অবসরের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছিল, সেই টুর্নামেন্টের শিরোপাই শেষ পর্যন্ত হয়ে ওঠে তার প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার।

২০২২: মেক্সিকোর বিপক্ষে জীবন বদলে দেওয়া গোল

কাতার বিশ্বকাপে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনার জন্য বাঁচা-মরার লড়াই। প্রথমার্ধ গোলশূন্য থাকার পর চাপ বাড়ছিল মেসিদের ওপর। ঠিক তখনই ৬৪ মিনিটে ত্রাতা হয়ে আসেন অধিনায়ক।

বক্সের বাইরে থেকে বাঁ-পায়ের দুর্দান্ত শটে মেক্সিকোর জালে বল পাঠান মেসি। গোলটি শুধু ম্যাচের গতিপথই বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল পুরো বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ভাগ্য। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা জেতে ২-০ গোলে। এরপরের গল্পটা সবারই জানা।

২০২২: বিশ্বকাপ হাতে মেসি

১৮ ডিসেম্বর ২০২২- আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দিন। ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপ ফাইনালে মেসি করেন দুটি গোল। টাইব্রেকারে আর্জেন্টিনার হয়ে প্রথম পেনাল্টিটিও সফলভাবে নেন তিনি। গনসালো মন্তিয়েলের শেষ পেনাল্টি জালে জড়ানোর পর মেসি হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ ফিরেছিল আর্জেন্টিনায়।

কাতারে মেসি শুধু বিশ্বকাপই জেতেননি, টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কারও পান। বহু বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে পূর্ণতা পায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।

২০২৬: বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা

৩৯ বছর বয়সে ২০২৬ বিশ্বকাপে মেসিকে নিয়ে ছিল নানা প্রশ্ন। কিন্তু বয়সকে যেন আবারও ভুল প্রমাণ করেন তিনি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচেই হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপে তার গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ১৬-তে। এরপর অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে আরও দুটি গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসে পুরুষদের সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি।

তার গোলসংখ্যা পৌঁছে যায় ১৮-তে। পেছনে পড়ে যান জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসা। পরে কিলিয়ান এমবাপে মেসিকে ছাড়িয়ে ২২ গোল নিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করেন। তবু ৩৯ বছর বয়সে মেসির রেকর্ড ভাঙার সেই মুহূর্তটি তার ক্যারিয়ারের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকে।

২০২৬: ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনাল

আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড দ্বৈরথের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’র পর এই লড়াই পেয়েছিল নতুন এক অধ্যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আবারও মুখোমুখি হয় দুই দল। আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠে।

ম্যাচে মেসি দুটি অ্যাসিস্ট করেন। ফলে ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার আরেকটি ঐতিহাসিক জয় আসে মেসির হাত ধরে।

২০২৬: শেষ অধ্যায়- স্পেনের কাছে ফাইনালে হার

আর শেষ পর্যন্ত মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের শেষ ম্যাচ হয়ে থাকে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনাল। স্পেনের বিপক্ষে ১-০ গোলে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও শেষ হয়ে যায়। ১২০ মিনিটের বেশি সময় ধরে আবেগ, শারীরিক ক্লান্তি ও চাপের সঙ্গে লড়াই করেও শেষ পর্যন্ত মেসি আরেকটি বিশ্বকাপ ট্রফি নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারেননি।

তবে হারলেও ২০২৬ বিশ্বকাপ মেসির জন্য হয়ে থাকে আরও একটি রেকর্ডের টুর্নামেন্ট। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি দলকে ফাইনালে নিয়ে যান, বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েন এবং শেষ ম্যাচ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কোটি কোটি সমর্থকের জন্য লড়ে যান।

দুই দশকের এক মহাকাব্যিক সমাপ্তি

২০০৫ সালে লাল কার্ড দিয়ে শুরু। এরপর হতাশা, ফাইনালে হার, অবসর ঘোষণা, আবার প্রত্যাবর্তন- তারপর কোপা আমেরিকা, বিশ্বকাপ এবং একের পর এক রেকর্ড। আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গল্প তাই শুধু ট্রফি জয়ের গল্প নয়। এটি অপেক্ষার, ব্যর্থতার, ফিরে আসার এবং শেষ পর্যন্ত পূর্ণতা পাওয়ার গল্প।

২০১৬ সালে যে খেলোয়াড় বলেছিলেন, ‘আমি সবকিছু চেষ্টা করেছি’, সেই মেসিই পাঁচ বছর পর আর্জেন্টিনার হয়ে কোপা আমেরিকা জিতেছেন। আরও এক বছর পর হাতে তুলেছেন বিশ্বকাপ।

২০২৬ সালের ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের মধ্য দিয়ে জাতীয় দলের জার্সিতে তার শেষ অধ্যায় নেমে এসেছে পর্দায়। কিন্তু আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে মেসির নামের পাশে লেখা থাকবে এমন কিছু মুহূর্ত, যেগুলো সময় পেরিয়েও মুছে যাওয়ার নয়।

আইএইচএস/



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *