অভিবাসী ভেবে পাকিস্তানের যুব ক্রিকেটারদের ঘিরে বিক্ষোভ!
ইংল্যান্ডে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভের মধ্যেই ঘটে গেল অদ্ভুত এক ঘটনা। দেশটিতে আশ্রয়প্রার্থী ভেবে পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের থাকার হোটেলের সামনে জড়ো হয়েছিলেন বিক্ষোভকারীরা। পরে জানা যায়, যাদের নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছিল, তারা আসলে পাকিস্তানের কিশোর ক্রিকেটার।
ঘটনাটি ঘটেছে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দক্ষিণ ইংল্যান্ডের পোর্টসমাউথ শহরে। পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্রিকেটাররা তখন শহরের কসামের একটি ম্যারিয়ট হোটেলে অবস্থান করছিলেন। এ সময় হোটেলের সামনে প্রায় ৩০ জন অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভকারী জড়ো হন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একটি কোচে একদল তরুণ এশীয় ব্যক্তিকে ওই হোটেলের কাছে দেখা যাওয়ার খবর অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পরই বিক্ষোভকারীরা সেখানে জড়ো হন। তাদের ধারণা ছিল, ওই ব্যক্তিরা সম্ভবত আশ্রয়প্রার্থী বা অভিবাসী।
পরে ঘটনাস্থলে যান অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক দল রিফর্ম ইউকের একজন কাউন্সিলর। বিষয়টি যাচাই করে তিনি নিশ্চিত হন, হোটেলে থাকা তরুণরা কোনো আশ্রয়প্রার্থী নন; তারা পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের সদস্য। এরপর তিনি বিক্ষোভকারীদের সেখান থেকে চলে যেতে সহায়তা করেন।
হ্যাম্পশায়ার পুলিশও ঘটনাটির সত্যতা নিশ্চিত করে। তবে পুলিশ সরাসরি পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের বিক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু বলা হয়নি বলে উল্লেখ করেছে।
পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হোটেলের কাছে একদল মানুষ জড়ো হওয়ার খবর পেয়ে কর্মকর্তারা সেখানে যান। সেখানে উপস্থিত লোকজন একটি কোচকে ঘিরে উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন। পুলিশ তাদের সঙ্গে কথা বলে জানায়, তাদের আশঙ্কার কোনো ভিত্তি নেই।
পরে প্রায় ৩০ জনের ওই দলটি অল্প সময়ের মধ্যেই সেখান থেকে চলে যায়। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা তীব্র। ইউরোপের মূল ভূখণ্ড থেকে ছোট নৌকায় করে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করে আশ্রয় চাওয়ার বিষয়টি দেশটির রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক বিক্ষোভ হয়েছে, যার কয়েকটিতে সহিংসতাও দেখা গেছে।
পোর্টসমাউথেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টা আগে অভিবাসীদের একটি দল শহরের কাছে পৌঁছানোর পর তাদের নামতে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বিক্ষোভকারীরা। এ সময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। ঘটনাটি ব্যাপকভাবে নিন্দিত হয়েছিল।
এর মধ্যেই পাকিস্তানের কিশোর ক্রিকেটারদের আশ্রয়প্রার্থী ভেবে হোটেলের সামনে বিক্ষোভের ঘটনা নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন স্ট্যান্ড আপ টু রেসিজমের জাতীয় সংগঠক মাইকেল ব্র্যাডলি ঘটনাটির তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, শরণার্থী ও অভিবাসীদের ‘বলির পাঁঠা’ বানানোর প্রবণতা সমাজে কতটা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে, এই ঘটনা তারই উদাহরণ।
ব্র্যাডলি বলেন, পাকিস্তানের অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের মতো একটি দলকে শুধুমাত্র তারা অভিবাসী হতে পারে- এমন ধারণা থেকে বিক্ষোভের মুখে পড়ার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার আশঙ্কা, এর ফলে যুক্তরাজ্যে কৃষ্ণাঙ্গ ও এশীয় জনগোষ্ঠীর যে কোনো মানুষই উগ্র ডানপন্থীদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।
তার ভাষায়, এই ধরনের পরিস্থিতির পরিণতি শেষ পর্যন্ত বর্ণবাদী হামলা ও আরও সহিংসতার দিকে যেতে পারে।
ঘটনাটির আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক দিক হলো, একই সময়ে পাকিস্তানের জাতীয় ক্রিকেট দলও ইংল্যান্ডে অবস্থান করছে। পাকিস্তানের সিনিয়র দল তখন বার্মিংহামের এজবাস্টনে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় টেস্ট খেলছিল।
অন্যদিকে পাকিস্তান অনূর্ধ্ব-১৯ দল ইংল্যান্ড সফরে নিজেদের ক্রিকেট কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছিল। ফলে ক্রিকেটের কারণে ইংল্যান্ডে থাকা পাকিস্তানি তরুণদের এমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে শুধু তাদের চেহারা ও পরিচয় নিয়ে তৈরি ভুল ধারণার কারণে।
আইএইচএস/
