September 8, 2026

অন্ধকার টানেলে ৯ দিন যেভাবে বেঁচে ছিলেন দুই শ্রমিক

0
og_1788834648_6a9f7358d6c3e.jpeg


নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের পর ধ্বংসস্তূপের নিচে একটি টানেলে টানা নয় দিন আটকে থেকেও বেঁচে ছিলেন দুই জলবিদ্যুৎকর্মী। ৪ সেপ্টেম্বর উদ্ধার করা হয় কবির মহার্জন ও সঞ্জয় সাহকে। তাদের বেঁচে থাকার ঘটনা এখন ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা অন্য শ্রমিকদের উদ্ধারে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

গত ২৬ আগস্ট নেপালের ত্রিশূলী উপত্যকায় ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে একটি হিমবাহ ধসে ব্যাপক কাদা ও পানির স্রোত নেমে আসে। এতে উপত্যকার ১২টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব প্রকল্পে প্রায় ৯০০ কর্মী ছিলেন। দুর্যোগে নেপাল ও পার্শ্ববর্তী তিব্বতে ১ হাজার ৩০০-এর বেশি মানুষ নিহত হন এবং বহু মানুষ নিখোঁজ হন।

এই দুর্যোগের সময় আপার ত্রিশূলী-৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে আশ্রয় নিয়েছিলেন কবির মহার্জন ও যন্ত্রপাতি বিভাগের ফোরম্যান সঞ্জয় সাহ। তারা এমন একটি জায়গায় আটকে পড়েন, যেখানে কিছুটা বাতাস জমে ছিল। সেই বাতাসের পকেটই শেষ পর্যন্ত তাদের জীবন বাঁচায়।

দুর্যোগের সকাল

দুর্যোগের দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে কাজে যাওয়ার আগে স্ত্রী হিরা শোভা মহার্জনকে ফোন করেছিলেন কবির। তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে টানেলের ভেতরে যেতে হবে এবং সেখানে মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না।

প্রায় এক ঘণ্টা পরই হিমবাহ ধসে পড়ে। পাহাড় থেকে নেমে আসা কাদা ও পানির প্রবল স্রোত আশপাশের এলাকা প্লাবিত করে।

কাঠমান্ডুতে নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যবেক্ষণ করছিলেন। একের পর এক প্রকল্পের সংকেত তাদের মনিটর থেকে অদৃশ্য হতে থাকে।

প্রথমে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝা যায়নি। পরে কর্মকর্তারা বুঝতে পারেন, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো একের পর এক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পের কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

সঞ্জয় সাহ তখন পাওয়ার হাউসের নিয়ন্ত্রণকক্ষে কাজ করছিলেন। তিনি এক তলা থেকে আরেক তলায় গিয়ে সহকর্মীদের সতর্ক করতে থাকেন।

কিন্তু বাইরে বের হওয়া অনেক কর্মীও প্রবল পানির স্রোত থেকে পালাতে পারেননি। উদ্ধারকারীরা পরে জানতে পারেন, একটি জরুরি সিঁড়ি ব্যবহার করা গেলে ভেতরে থাকা অনেক শ্রমিকই হয়তো বের হতে পারতেন। কিন্তু কর্মীরা সেই পথ সম্পর্কে জানতেন না।

অন্ধকার টানেলেই নয় দিন

উদ্ধারকারীরা পরে চারটি প্রবেশপথের মধ্যে একটি তুলনামূলক নিরাপদ পথের দিকে নজর দেন। এই পথটি ছিল কিছুটা উঁচু এবং বন্যার পানির সরাসরি প্রভাব থেকে কম ঝুঁকিপূর্ণ।

সেখানেই প্রায় ১৬০ মিটার ভেতরে আটকে ছিলেন কবির ও সঞ্জয়।

পরবর্তী নয় দিন তাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন ছিল। সম্পূর্ণ অন্ধকারে কাদামিশ্রিত পানির মধ্যে কোনোভাবে বেঁচে ছিলেন তারা। সাহ নিজের মনোবল ধরে রাখতে হিন্দু ধর্মীয় প্রার্থনা করতেন। আর কবির বেঁচে থাকার জন্য টানেলে জমে থাকা কাদামিশ্রিত পানি পান করতেন বলে তার স্ত্রী জানিয়েছেন।

এদিকে কবিরের স্ত্রী বারবার তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। কিন্তু কোনো সাড়া পাননি। পরে ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রকল্পের ছবি দেখে তিনি ধরে নিয়েছিলেন, তাঁর স্বামী আর বেঁচে নেই।

তবু দুই সন্তানকে তিনি সাহস জোগাতে থাকেন।

উদ্ধার অভিযানেও ছিল বড় ঝুঁকি

দুর্যোগের পর উদ্ধারকারীরা ধারণা করেন, ধ্বংসস্তূপের বিভিন্ন জায়গায় বাতাস আটকে থাকতে পারে। তাই কোথায় আগে খনন করা হবে, তা নিয়ে তাদের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়।

আপার ত্রিশূলী-৩এ প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কারণ, ভবনের বিভিন্ন স্তরে বাতাস আটকে থাকার সম্ভাবনা ছিল।

তবে উদ্ধারকাজ শুরু করা সহজ ছিল না। ধ্বংসস্তূপ এতটাই ভেজা ও নরম ছিল যে ভারী যন্ত্রপাতি সহজে সেখানে নেওয়া যাচ্ছিল না। প্রথমে স্থিতিশীল জায়গা তৈরি করতে হয়।

দুর্যোগের তিন দিন পর বড় ধরনের খনন শুরু হয়। টানেলের প্রবেশপথগুলো কাদা, পাথর, কাঠ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষে বন্ধ হয়ে ছিল। কোথাও ১৫ থেকে ৩০ মিটার পর্যন্ত ধ্বংসস্তূপ জমে ছিল।

উদ্ধারকারীরা ড্রিলিং, নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ এবং ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ধীরে ধীরে পথ তৈরি করতে থাকেন।

একপর্যায়ে ওপর থেকে একটি সরু ছিদ্র করে টানেলের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করা হয়। কিন্তু টানা বৃষ্টি উদ্ধারকাজ আরও কঠিন করে তোলে। কয়েক দফা বৃষ্টিতে খনন করা জায়গা আবার পানি ও ধ্বংসাবশেষে ভরে যায়।

প্রায় ছয় দিন পর উদ্ধারকারীরা টানেলের চাপা পড়া প্রবেশপথের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হন। কিন্তু তখনও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না।

মিলল বেঁচে থাকার সংকেত

উদ্ধারের আগের রাতে উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসাবশেষের একটি শক্ত স্তরের সামনে আটকে যান। পরে তারা টানেলের কিছুটা ওপরে থাকা একটি প্রাকৃতিক পানিপথ ব্যবহার করে উচ্চচাপের পানি দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরানোর চেষ্টা করেন।

এর মধ্যেই আবার বৃষ্টি শুরু হয় এবং ধ্বংসস্তূপের একটি অংশ ধসে পড়ে। এতে কয়েকজন উদ্ধারকারীও কিছু সময়ের জন্য আটকে যান। পরে পথটি ধাতব পাত ও তারের কাঠামো দিয়ে শক্ত করা হয়।

দুর্যোগের দশম দিনের ভোর ৪টার দিকে উদ্ধারকারী দল খবর পায়—টানেলের ভেতর থেকে সম্ভবত কোনো শব্দ পাওয়া গেছে।

উদ্ধারকারীরা বারবার যন্ত্রপাতি বন্ধ করে নীরব হয়ে সেই শব্দ শোনার চেষ্টা করেন। তারা ভেতরে চিৎকার করে জানতে চান, কেউ সেখানে আছেন কি না।

একপর্যায়ে তারা বুঝতে পারেন, শব্দের উৎস মাত্র ১৫ থেকে ২০ মিটার দূরে। পরে আলো ফেলতেই ধ্বংসস্তূপের মধ্যে একটি হাত দেখা যায়।

আরও কয়েক মিটার কাদা সরানোর পর সকাল ৭টার দিকে সেনাসদস্যরা ছোট একটি গর্ত তৈরি করতে সক্ষম হন। ভেতর থেকে শোনা যায়—আমরা এখানে আছি।

নয় দিন পর আলোয়

অবশেষে উদ্ধারকারীরা কবির ও সঞ্জয়কে টানেল থেকে বের করে আনেন। দুজনই এতটাই দুর্বল ছিলেন যে নিজেরা দাঁড়াতে পারছিলেন না। সঞ্জয়কে একজন উদ্ধারকারী বহন করে বাইরে নিয়ে আসেন। কবিরকে স্ট্রেচারে করে বের করা হয়।

তাদের উদ্ধারের খবর শুনে কবিরের দুই ছেলে আনন্দে চিৎকার করে ওঠে, বাবা ফিরে এসেছেন।

হাসপাতালে কবিরের পায়ে গুরুতর সংক্রমিত একটি ক্ষত পাওয়া যায়। চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করেন। পরে স্ত্রী তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে কবির তাঁকে চিনতে পারেননি। তিনি বিভ্রান্ত হয়ে জানতে চান, তিনি কোথায় আছেন।

তবে স্বামীকে জীবিত ফিরে পাওয়াতেই খুশি হিরা শোভা। তাঁর ভাষায়, কবির যেন নতুন জীবন পেয়েছেন।

এই দুই শ্রমিকের নয় দিনের বেঁচে থাকার ঘটনা এখন নেপালের ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা অন্যদের উদ্ধারে আশার আলো দেখাচ্ছে। সোমবার পর্যন্ত প্রায় ১২১ শ্রমিক বিভিন্ন টানেলে আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল।

সূত্র: রয়টার্স

এমএসএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *