September 9, 2026

না ফিরল সন্তান না এল ক্ষতিপূরণ

0
ngonj-20260728142846.jpg


স্বপ্ন ছিল বিপুল পরিমাণ টাকা আয় করবেন। সেই আয় দিয়ে সংসারের হাল ধরবেন। পরিবারের সদস্যদের ভাগ্য ফেরাবেন। আর তাই পাড়ি জমিয়েছিলেন দেশ ছেড়ে সুদূর প্রবাস দক্ষিণ আফ্রিকায়। কিন্তু সেই স্বপ্নই যেন তাদের কাল হয়ে দাঁড়ালো। স্বপ্নের সঙ্গে পুড়ে ছাই হলো জীবনটাও।

এদিকে সন্তান পুড়ে ছাই হলেও সেটি ফেরত পাননি পরিবারের সদস্যরা। একইসঙ্গে তাদের কোনো রকম ক্ষতিপূরণ কিংবা আর্থিক সহযোগিতা কোনোটাই মিলছে না। আবার কারো কারো পাওনা থাকলে সেটাও যেন পরিশোধ করা হচ্ছে না।

গত ২৮ জুলাই রাতে দক্ষিণ আফ্রিকার কুইন্স টাউনের একটি সুপারশপে আগুন লাগে। সেই আগুনে ঘুমন্ত অবস্থায় পুড়ে প্রাণ হারান ৬ বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে ৫ জন নারায়ণগঞ্জের আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের এবং বাকি একজন মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা।

নিহতরা হলেন- নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকের চর এলাকার মনির হোসেনের ছেলে মো. ফাহিম (২৯), একই এলাকার আলী মিয়ার ছেলে আপন আহমেদ (২৩) ও মৃত শরব আলীর ছেলে নুর মোহাম্মদ (৫৫), একই ইউনিয়নের তৈলখিয়ার চর এলাকার ফারুক হোসেনের ছেলে মো. ফয়সাল (২৬), বক্তাবলী ইউনিয়নের মৃত আক্তার হোসেনের ছেলে মো. শাহিন (৩০) ও মুন্সিগঞ্জ সদরের মিরকাদিম পৌরসভার কালিন্দিপাড়া এলাকার মৃত সালাম বেপারির ছেলে মো. রাজিক (৫৫)।

মৃত্যুর প্রায় ১ মাস ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত তারা কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। সেইসঙ্গে তাদের মরদেহগুলোও দক্ষিণ আফ্রিকায় দাফন করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ফলে পরিবারের সদস্যরা ধরেই নিয়েছেন তাদের কাছে মরদেহ আর ফেরত আসছে না।

নিহতদের একজন বক্তাবলী ইউনিয়নের রামনগর পশ্চিম এলাকার বাসিন্দা শাহীন। ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়ে দাদির কাছে বড় হয়েছেন। পরিবারের বড় ছেলে হওয়ায় কিশোর বয়সেই সংসারের দায়িত্ব নিতে হয় তাকে। ফলে সংসারের অভাব পূরণে ২০১৮ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে দক্ষিণ আফ্রিকায় পাড়ি জমান শাহীন। কিন্তু দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকেও তাদের আর্থিক সংকট কাটেনি।

শাহীনের দাদি নুরজাহান বেগম বলেন, একে একে আমার পরিবারের সবাই মারা যাচ্ছে। শাহীন বলেছিল চলে আসবে। কিন্তু তার আর বাড়ি ফেরা হলো না। সে যেখানে কাজ করতো তার অনেক টাকা পাওনা ছিল। কিন্তু এখন সেই টাকা আর ফেরত পাওয়ার কোনো খবর পাচ্ছি না। মরদেহের আশাও ছেড়ে দিয়েছি, সেখানে তার দাফন হয়েছে বলে শুনেছি।

নিহত আরেকজন আলীরটেক ইউনিয়নের ক্রোকেরচর এলাকার বাসিন্দা আপন আহমেদ। আপনের স্বপ্ন ছিল বাড়ি নির্মাণ করে একমাত্র বোনের বিয়ে দেবেন। সেজন্য প্রায় ১০ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বাড়ি নির্মাণের কাজ শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার মৃত্যুর পর সেই বাড়ি অর্ধনির্মিত রয়ে গেছে।

আপন আহমেদের বাবা আলী মিয়া বলেন, ২০২১ সালে ৫ বছরের চুক্তিতে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন আপন। দুই মাস পরই তার বাড়ি ফেরার কথা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কিছুই পেলাম না। আগুনে তার মরদেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। যার কারণে মরদেহ দেশে না এনে সেখানেই দাফন করেছে। মৃত্যুর পর আমাদের সঙ্গে কেউ যোগাযোগও করেনি।

একই এলাকার মনির সরকারের ছেলে ফাহিমও ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহত হন। ৩ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে বড় ছিলেন তিনি। জীবিকার তাগিদে ২০১৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান ফাহিম। দীর্ঘ প্রবাসজীবন শেষে চলতি বছরের ডিসেম্বরেই দেশে ফেরার কথা ছিল তার।

নিহত মো. ফাহিমের মা লুৎফা আক্তার বলেন, আমার কলিজা আমাকে ছেড়ে চলে গেল। আমার ছেলেটা সংসারের বড় ছিল। সংসারের হাল ধরতে গিয়ে তাকে আগুনে পুড়ে ছাই হতে হলো। আমাদের ইচ্ছা ছিল দেশে ফেরার পর ধুমধাম করে তাকে বিয়ে করাবো। কিন্তু এখন তার কিছুই হলো না। শেষ পর্যন্ত তার মুখটাও দেখার সুযোগ হলো না।

একই এলাকার বাসিন্দা মৃত শরব আলীর ছেলে নুর মোহাম্মদ। তার সংসারে রয়েছে দুই মেয়ে এক ছেলে। সন্তানদের ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে গিয়ে দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। বলেছিলেন দেড় মাস পর বাড়ি চলে আসবেন। কিন্তু তার আর বাড়ি আসা হলো না।

নিহত নুর মোহাম্মদের ছেলে সিয়াম বলেন, বাবা বলছিল দেড় মাস পর বাড়ি এসে আবার যাবেন। দেশে আর আসা হলো না। বাবাকে আর দেখার সুযোগ হলো না। শুনেছি সেখানেই মরদেহ দাফন করেছে। বাবা মারা যাওয়ার পর আমাদের সঙ্গে কেউ কোনো যোগাযোগ করেনি।

এভাবে প্রত্যেকেরই স্বজনদের দাবি- নিহতদের পরিবারকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। পাশাপাশি তাদের কোনো বকেয়া বেতন বা অন্য পাওনা থাকলে তা যাচাই করে দ্রুত পরিশোধের ব্যবস্থা করতে হবে।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম ফয়েজ উদ্দিন বলেন, আমরা নিহতদের পরিবারের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি। সরকার থেকে আর্থিক অনুদান প্রাপ্তির জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলে আমরা তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবো।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানিয়েছে, যারা মারা গিয়েছে তাদের অধিকাংশেরই বৈধ কাগজপত্র ছিল না। যার কারণে তাদের ক্ষতিপূরণ কিংবা মরদেহ ফেরত আনার ব্যাপারে কোনো সহযোগিতা করার সুযোগ থাকছে না।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রবাসী ও প্রবাস ফেরত কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু রায়হান বলেন, একজন প্রবাসীর কিছু হলে তার মরদেহ ফেরত আনা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা মৌলিক দাবি। সরকারের নিজ উদ্যোগেই এটা করা উচিত। তাদের বৈধ উপায়ে যাওয়া হয়নি বলে এই মানবিক বিষয়টিকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেইসঙ্গে এই বিষয়টি নিয়ে আমরাও সেরকম উদ্যোগ নিতে পারছি না। কারণ আমাদের কাছে কোনো কাগজ নেই। তারপরও আমাদের চেষ্টা থাকবে তাদের জন্য কিছু করার।

মোবাশ্বির শ্রাবণ/এফএ



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *