September 1, 2026

‘খামটি হাতে পেয়ে হাইস্কুল জীবনে প্রেমপত্রের কথা মনে পড়ে গেল’

0
letter1-mtifrmec07hq2o0-20260901150141.jpg


বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজের প্রধান ফটকের সামনে বিকেলের ব্যস্ততা। চারপাশে শিক্ষার্থীদের ব্যস্ত আনাগোনা আর পথচারীদের দ্রুত পায়ে হেঁটে চলা। এর মধ্যেই আচমকা সামনে এসে দাঁড়াল একদল তরুণ। হাতে তুলে দিলো একটি নীল রঙের খাম। খামটি হাতে পেয়েই থমকে গেলেন অনেকে। স্মার্টফোনের অন্তহীন নোটিফিকেশনের যুগে এমন অচেনা উপহার কি শুধুই এক টুকরো কাগজ, নাকি হারিয়ে যাওয়া কোনো ব্যাকুল সময়ের ছোঁয়া?

মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিশ্ব চিঠি দিবস উপলক্ষে এমনই এক মুহূর্ত তৈরি হয় বগুড়া শহরের বিভিন্ন প্রান্তে। প্রযুক্তির অতিব্যবহার আর যান্ত্রিক জীবনে যখন মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগের আবেগ ফিকে হতে বসেছে, ঠিক তখন ‘টিফিন ম্যাগাজিন বাংলাদেশ’-এর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নজর কাড়ে সবার। দিনটিতে শহরের শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের মাঝে বিতরণ করা হয় প্রায় ৫০০টি চিঠি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফিড স্ক্রল করা কিংবা মেসেঞ্জারে মুহূর্তের মধ্যে বার্তা পাঠানোর অভ্যাসে অভ্যস্ত তরুণ প্রজন্মের কাছে চিঠি পাওয়াটা ছিল এক সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। মোবাইল স্ক্রিনের বাইরে এসে বই আর সাহিত্যের সুবাসে তরুণদের যুক্ত করতেই এই বিশেষ আয়োজন। বগুড়ার পাশাপাশি ঢাকা, রাজশাহী, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রামে একযোগে চলে চিঠির মাধ্যমে আবেগ ছড়িয়ে দেওয়ার এই ভিন্নধর্মী প্রচার অভিযান।

সংগঠনটির সহ-সম্পাদক টি এম রিফাত অলম ও মোহাম্মদ ছাদিকুর রহমান রিফাত জানান, বর্তমান তরুণ সমাজে ফোনের আসক্তি কমানোই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। যান্ত্রিকতার মোড়ক থেকে বের করে এক চিলতে অপেক্ষার আনন্দ ও সাহিত্যমুখী ভাবনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই তাদের এই উদ্যোগ।

চিঠি হাতে পাওয়ার আকস্মিক অভিজ্ঞতায় আজিজুল হক কলেজের ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষার্থী সোহেল স্মৃতি হাতড়ে বলেন, ‌‘অনলাইনের দ্রুত যোগাযোগের যুগে চিঠির ভেতরে লুকিয়ে থাকা যে গভীর অপেক্ষা, তা থেকে আমরা সত্যি বঞ্চিত। হঠাৎ এই খামটি হাতে পেয়ে হাইস্কুল জীবনে লেখা গোপন প্রেমপত্রের কথা মনে পড়ে গেল। আজকের এই অনুভূতিটা শহরের যান্ত্রিকতার মাঝে একদমই আলাদা।’

ঐশী আক্তারের জীবনে আবার এটাই প্রথম চিঠি পাওয়ার স্মৃতি। নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার জীবনে কখনো চিঠি আসেনি, আজই প্রথম পেলাম। আগের দিনের মানুষ যেভাবে প্রিয়জনের একটা খবরের জন্য অধীর আগ্রহে ব্যাকুল হয়ে থাকত, আজকাল তাৎক্ষণিক মেসেজের ভিড়ে সেই মধুর অপেক্ষাটা হারিয়ে গেছে।’

বিয়াম মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী সাব্বিরের ভাষ্য, ‘এই সময়ের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে যদি আবার এমন চিঠি লেখার চর্চা ফিরে আসে, তবে তা সাহিত্য ও মানবিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বেশ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।’

তরুণদের এই নতুন অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রবীণ পথচারীদের কাছে উদ্যোগটি ছিল শৈশব ও কৈশোরের সোনালি দিনে ফিরে যাওয়ার মাধ্যম। শহরের ষাটোর্ধ্ব বাসিন্দা জালাল আবেগাপ্লুত কণ্ঠে স্মরণ করেন প্রবাস জীবনের গল্প।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘৫০-৬০ বছর আগের কথা। বিদেশে থাকার সময় মায়ের একটা মাত্র চিঠির জন্য তাকিয়ে থাকতাম। এখন এক সেকেন্ডেই পৃথিবীর সব খবর পাওয়া যায় ঠিকই, তবে কাগজের গায়ে লেপ্টে থাকা সেই পারিবারিক উষ্ণতা ও সম্পর্কের গভীরতা আধুনিক প্রযুক্তিতে আর খুঁজে পাওয়া যায় না।’

বিতরণ করা নীল খামের ভেতরে লেখা বার্তাটি মানুষকে টেনে নিয়েছিল গভীর ভাবনায়। লেখা ছিল, ‘একসময় একটা নীল খাম কিংবা এক টুকরো কাগজের চিঠিতে জমা থাকতো মান-অভিমান, ভালোবাসা, অপেক্ষা আর এক চিলতে রোদ… এই এক টুকরো কাগজ আপনার আজকের বিষণ্ন ব্যস্ত দিনটায় দু-দণ্ড ভালো লাগার কারণ হবে—এটুকুই আমাদের প্রত্যাশা।’

এলবি/এসআর/জেআইএম



Source link

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *