পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে পেয়েও যোগাযোগ করতে দ্বিধা হয় কেন?
সময় যত যায়, জীবনের ব্যস্ততাও তত বদলায়। একসময় যে মানুষগুলোকে ছাড়া একটি দিনও কল্পনা করা যেত না, তাদের অনেকেই ধীরে ধীরে জীবনের গল্প থেকে দূরে সরে যান। স্কুলের বেঞ্চ ভাগ করে নেওয়া বন্ধু, কলেজের আড্ডার সঙ্গী কিংবা শৈশবের কোনো কাছের মানুষ-বছরের পর বছর যোগাযোগ না থাকলেও হঠাৎ একদিন তাদের কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, মানুষটি এখন কোথায় আছেন? কেমন আছেন? জীবন কীভাবে কাটছে?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে এখন হারিয়ে যাওয়া পুরনো বন্ধুদের খুঁজে পাওয়াও বেশ সহজ। নাম লিখে সার্চ করলেই সামনে চলে আসতে পারে অনেক বছরের পুরোনো পরিচিত মুখ। কিন্তু প্রোফাইল খুঁজে পেলেই যে সবাই যোগাযোগ করেন, তা নয়। বরং অনেকের মনেই তখন দ্বিধা তৈরি হয়-হঠাৎ মেসেজ দিলে তিনি কী ভাববে?
এত বছর পর কথা বলা কি অস্বস্তিকর হবে?
মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, পুরোনো বন্ধুত্বের দিকে ফিরে তাকানোর পেছনে একাধিক মানসিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে যেমন রয়েছে কৌতূহল ও নস্টালজিয়া, তেমনি নিজের অতীতকে নতুন করে বোঝার চেষ্টাও থাকতে পারে।
শুধু কৌতূহল থেকেও যোগাযোগ হতে পারে
পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে আবার যোগাযোগের সবচেয়ে স্বাভাবিক কারণ হতে পারে নিছক আগ্রহ। একসময় যার সঙ্গে প্রতিদিন কথা হতো, সেই মানুষটি এত বছর পর কেমন আছেন-জানার ইচ্ছা থেকেই যোগাযোগের শুরু হতে পারে।
বিশেষ করে জীবনের কোনো একটি পর্যায়ে এসে মানুষ যখন নিজের অতীতের দিকে তাকান, তখন পুরোনো পরিচিতদের বর্তমান জীবন সম্পর্কে কৌতূহল তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কেউ কোথায় থাকেন, কী কাজ করেন, পরিবার কেমন-এসব জানার আগ্রহ থেকেই একটি সাধারণ ‘কেমন আছ?’ বার্তা পাঠানো হতে পারে।
পুরোনো বন্ধুর মধ্যে নিজের পুরোনো পরিচয় খুঁজে পাওয়া
পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বলার আরেকটি কারণ হতে পারে নিজের অতীতের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। সময় মানুষের জীবনকে বদলে দেয়। দায়িত্ব বাড়ে, পেশা বদলায়, পরিবার ও সামাজিক অবস্থান বদলায়। সেই সঙ্গে বদলে যায় নিজের সম্পর্কে ধারণাও। বর্তমান জীবনে যারা আমাদের চেনেন, তারা হয়তো আমাদের আজকের পরিচয়টাই জানেন। কিন্তু শৈশব বা কৈশোরের বন্ধুরা জানেন আমাদের সেই সময়ের গল্প-কী নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম, কোন বিষয়ে হাসতাম, কী নিয়ে ভয় পেতাম।
তাই পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কয়েক মিনিটের কথোপকথনও অনেক সময় ফিরিয়ে আনতে পারে হারিয়ে যাওয়া কিছু স্মৃতি। মনে হতে পারে, বর্তমান পরিচয়ের আড়ালে থাকা সেই পুরনো মানুষটির সঙ্গে আবার দেখা হলো।
পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে কথা বললে ফিরে আসতে পারে শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি
জীবনের হিসাব মেলানোর সময় আসে
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ নিজের জীবন নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। কোথায় পৌঁছেছেন, কী অর্জন করেছেন, কোন স্বপ্ন পূরণ হয়েছে আর কোনগুলো অপূর্ণ থেকে গেছে-এমন অনেক প্রশ্ন তখন মনে আসতে পারে।
এই জায়গায় পুরোনো বন্ধুরা এক ধরনের মানসিক আয়নার মতো কাজ করতে পারেন। কারণ তাদের জীবনযাত্রার শুরুটাও অনেকটা একই সময়ে, একই পরিবেশে। ফলে বহু বছর পর তাদের জীবনের সঙ্গে নিজের বর্তমান অবস্থার তুলনা করার সুযোগ তৈরি হয়।
এই তুলনা কারো জন্য আনন্দের হতে পারে। বন্ধুর সাফল্য দেখে অনুপ্রেরণা আসতে পারে, পুরোনো বন্ধুত্ব নতুন করে জীবনে ইতিবাচক অনুভূতি আনতে পারে। আবার উল্টোভাবে নিজের অপূর্ণতা নিয়ে আফসোস বা হতাশাও তৈরি হতে পারে। তাই অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবন মেলানোর সময় বাস্তবতাকে মাথায় রাখা জরুরি।
পুরোনো সম্পর্ক মানেই কি আগের মতো বন্ধুত্ব?
পুরোনো বন্ধুকে খুঁজে পাওয়া আনন্দের হলেও যোগাযোগের আগে কিছু বিষয় ভেবে দেখা ভালো। বিশেষ করে সম্পর্কটি যদি কোনো ভুল বোঝাবুঝি, অভিমান বা তিক্ততার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে থাকে, তাহলে বহু বছর পর যোগাযোগ পুরনো ক্ষতও সামনে নিয়ে আসতে পারে।
আবার এটিই হতে পারে ভুল বোঝাবুঝি দূর করার সুযোগ। সময় অনেক সময় মানুষকে পরিণত করে। ফলে অতীতের কোনো ঘটনার দিকে দুজনই হয়তো এখন ভিন্নভাবে তাকাতে পারেন। ক্ষমা চাওয়া, কথা বলে পুরোনো সম্পর্কের একটি সুন্দর সমাপ্তি টানা কিংবা নতুন করে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি হতে পারে।
কখনো পুরোনো বন্ধুকে খোঁজা মানে নিজের পুরোনো সত্তাকেও খুঁজে দেখা
মানুষ বদলায়, বন্ধুত্বও বদলায়
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে মানুষ আগের মতো থাকে না। একসময় যে বিষয় নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা হতো, বয়স বাড়ার পর সেটি হয়তো আর গুরুত্বপূর্ণ মনে নাও হতে পারে। মূল্যবোধ, পেশা, জীবনযাপন, দায়িত্ব কিংবা ব্যক্তিগত অগ্রাধিকারে পরিবর্তন আসতে পারে।
তাই অনেক বছর পর পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে আগের সম্পর্কটি হুবহু ফিরে আসবে-এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো। বরং নতুন মানুষ হিসেবে একে অপরকে জানার মানসিকতা থাকলে সম্পর্কটি স্বাভাবিকভাবে এগোতে পারে।
শেষ পর্যন্ত পুরোনো বন্ধুর কথা মনে পড়া মানেই অতীতে ফিরে যেতে চাওয়া নয়। কখনো এটি নিছক কৌতূহল, কখনো নস্টালজিয়া, আবার কখনো নিজের জীবনের একটি পুরোনো অধ্যায়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা। আর যদি যোগাযোগ করতেই ইচ্ছা করে, একটি সাধারণ একটি ছোট বার্তাই হয়তো খুলে দিতে পারে বহুদিন বন্ধ থাকা একটি দরজা।
সূত্র: সাইকোলজি টুডে, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস
এসএকেওয়াই


