এত গাড়ি কোথায় চলবে?
কাজী মিতুল
সেই ছোট্টবেলার কথা। আমি তখন এক গ্রাম্য বালক। আমার বড়চাচা ঈদের ছুটিতে ঢাকা থেকে আমাদের গ্রামে এলে তার ঢাউস সরকারি জিপ দেখে আমিও স্বপ্ন দেখতাম, বড় হয়ে গাড়ি করে অফিস যাব, বাড়ি ফিরে গেটের সামনে হর্ন দিয়ে জানান দেব, আমি গাড়ি করে এসেছি….। আজ তার ৪০ বছর পর সেই সাধ কি পূরণ হলো? গাড়ি যে পথেই রেখে বাড়ি ফিরতে হয়।
শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসের ইন্দ্র-র একটি পুরাতন ফোর্ড গাড়ি ছিল। ‘সেই গাড়িতে চড়েছি যত, ঠেলেছি তার ঢের বেশি।’- লাইনটা আমার বেশ লেগেছিল। ইন্দ্র-র গাড়ির মতো আমার গাড়িটা ‘মেকানিক্যাল ট্রাবল’ না দিলেও, আমি গাড়িতে চড়ার চেয়ে ঠেলিই বেশি। কীভাবে? বলছি।
সকালে বাসা থেকে বের হয়েই জ্যামের কারণে গাড়ি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে পাড়ার মোড়ে। পুত্রকে কলেজে নামিয়ে দেব বলে গাড়িতে তুলেছিলাম, কিন্তু ক্লাসে ‘লেট’ খাওয়ার ভয়ে সে গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে জ্যাম পাড়ি দিয়ে রিকশা নিয়ে চলে যায়। আমি জ্যাম ঠেলি, নাকি গাড়িটাই ঠেলি, কী করে বলি?
গুলশানে অফিসের কাছাকাছি পৌঁছে দেখি মরণফাঁদের মতো জ্যাম। সিগনাল বাতি একবার লাল হলে আর যেন সবুজ হতে চায় না। আর সবুজ হলেও আমার গাড়ি সেটা পার হবার আগেই সে ক্ষেপে আবার লাল!
গাড়ি ছেড়ে হাঁটা ধরি, আমাকে তো মিটিং-এ সময় মতো পৌঁছাতে হবে, আজকাল জ্যামের অজুহাত কেউ আমলে নেয় না। হাতে সময় কম থাকলে একটা উড়ন্ত ‘টেসলা’ ডেকে নিই, সে জাদুর কার্পেটের মতো আমাকে যেন উড়িয়ে নিয়ে যায় আঁকা-বাঁকা পথে।
সন্ধ্যায় আমার বাড়ি ফেরার চিত্র আরো বিচিত্র। আমি অফিস থেকে বের হবার আধ ঘণ্টা আগে ড্রাইভারকে বলি ‘গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যাও, সিগনাল পেরিয়ে কোথাও অপেক্ষা করো’। অফিসের অন্য বাবুদের মতো স্যুট পরে অফিস থেকে বেরিয়ে গট গট করে আমি গাড়িতে উঠে বসতে পারি না। কিলোখানেক হেঁটে ঘর্মাক্ত কলেবরে হাফাতে হাফাতে গাড়িতে গিয়ে ঢুকি। এসির হাওয়ায় সে ঘাম শুকায়। তবু সময় তো বাঁচলো!
১০ কিলোমিটার পথ ঘণ্টাখানেকের চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেষে বাসার কাছাকাছি মোড়টায় আবার যখন জ্যামে দাঁড়িয়ে গাড়িটা গাধার মতো ঝিমোতে থাকে, আমি সেই ঘামে ভেজা জামাটা আবার ঘামে ভিজিয়ে বাসায় ঢুকি। গিন্নির কাছে গিয়ে দাঁড়ালে তিনি নাক বন্ধ করে আমাকে স্নানঘরের পথ বাতলে দেন। এই হলো রোজনামচা।
ফুটপাতে যে হাঁটব, সেটিরও জো নেই। হয় সেখানে দোকান বসেছে, নাহয় কেউ বাইক পার্ক করে রেখেছে। কোথাও আবার ফুটপাত আর নর্দমা পরস্পরকে ভালবেসে একে অপরের মাঝে হারিয়ে গেছে। এর মধ্যে হাঁটি কী করে? তার ওপর কথায় কথায় চলে যায় বিদ্যুৎ। অন্ধকারে কোথাও ওঁত পেতে থাকে ছিনতাইকারী, কোথাও ডেংগু মশা।
আজকাল টেসলা বেড়েছে পংগপালের মতো। হিসেব করে দেখলাম, প্রতি একজন যাত্রীর জন্য এখন মোড়ে মোড়ে গোটা তিনেক টেসলা দাঁড়িয়ে থাকে। এরা না জানে ট্রাফিক আইন, না জানে ভদ্র আচরণ। মাস দুয়েক আগে একজন আমার গাড়িতে ধাক্কা দিয়ে উলটে আমার থেকেই ক্ষতিপূরণ নিয়ে গেল! এ যেন যার শীল, যার নোড়া, ভাংলো তার দাঁতের গোড়া!
যান্ত্রিক এই নগরে নাগরিক জীবনের যন্ত্রণার এই যখন হাল, তখনও প্রতিদিন ঢাকার জনসংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। ২৮ বছর আগে তল্পিতল্পাসহ আমি যেমন এসেছিলাম, অন্যরাও আসছে৷ প্রত্যেকের মনে প্রায় একই আশা, এই ঢাকায় একদিন তার বাড়ি হবে, গাড়ি হবে৷ প্রশ্ন হলো, সেই গাড়ি তারা কোথায় চালাবে?
এমআরএম

