নব্বইয়ের দশকে যেসব সিনেমার গান ঝড় তুলেছিল
নব্বইয়ের দশক মানেই একরাশ নস্টালজিয়া। সেই সময় বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সিনেমা, রেডিও আর ক্যাসেট। বিকেল হলেই পাড়া-মহল্লায় বাজত প্রিয় সিনেমার গান। রেডিওর ‘অনুরোধের আসর’ কিংবা ক্যাসেট প্লেয়ারে বারবার শোনা গানগুলো হয়ে উঠেছিল মানুষের জীবনেরই অংশ। তাই নব্বইয়ের দশকের সিনেমার গান এখনো অনেকের স্মৃতিতে আলাদা জায়গা দখল করে আছে।
এই দশকেই ঢাকাই চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেন সালমান শাহ, শাবনূর, মৌসুমী, মান্না, রিয়াজসহ একঝাঁক তারকা। তাদের পর্দার জনপ্রিয়তার সঙ্গে সমানতালে শ্রোতাদের মাতিয়েছেন এন্ড্রু কিশোর, খালিদ হাসান মিলু, সাবিনা ইয়াসমিন, কনকচাঁপা, আগুন, আইয়ুব বাচ্চু, সুবীর নন্দীসহ অনেক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী।
নব্বইয়ের দশকে চলচ্চিত্রে অসংখ্য গান জনপ্রিয় হয়েছিল। সেসব গান থেকে বাছাই করে ১৫টি গান তুলে ধরা হলো। তবে এটিকে নব্বইয়ের দশকের সেরা ১৫ গানের তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্য থেকে এলোমেলোভাবে বেছে নেওয়া হয়েছে এগুলো।
ভালো আছি ভালো থেকো: ১৯৯৬ সালে মুক্তি পাওয়া ‘তোমাকে চাই’ ছিল সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত আলোচিত সিনেমা। তবে সিনেমাটিকে আলাদা করে মনে রাখার অন্যতম কারণ ‘ভালো আছি ভালো থেকো’ গানটি। রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখা গানটি এন্ড্রু কিশোর ও কনকচাঁপার কণ্ঠে জনপ্রিয়তা পায়। গানটির কথা ও সুরের আবেগ আজও নব্বইয়ের প্রেম-বিরহের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
এখন তো সময় ভালোবাসার: ১৯৯৩ সালের ২০ মার্চ মুক্তি পায় ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’। এই সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক হয় সালমান শাহ ও মৌসুমীর। সিনেমাটির গানগুলো সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এর মধ্যে রুনা লায়লা ও আগুনের কণ্ঠে ‘এখন তো সময় ভালোবাসার’ গানটি শ্রোতাদের কাছে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
এখানে দুজনে নিরজনে: ১৯৯৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘অন্তরে অন্তরে’ সিনেমায় অভিনয় করেন সালমান শাহ, মৌসুমী ও রাজীব। আলম খানের সংগীত পরিচালনায় সিনেমাটির ‘এখানে দুজনে নিরজনে’সহ বেশ কয়েকটি গান জনপ্রিয় হয়। রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে গানটি নব্বইয়ের দশকের শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নেয়।
যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে: মোহাম্মদ হান্নান পরিচালিত ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। রিয়াজ ও ভারতের রবীনা ট্যান্ডন অভিনীত সিনেমাটির ‘যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে’ গানটি সে সময় মানুষের মুখে মুখে ফিরত। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সুরে খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাঁপার কণ্ঠে গানটি জনপ্রিয়তা পায়।
পড়ে না চোখের পলক:‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ সিনেমার আরেকটি জনপ্রিয় গান ‘পড়ে না চোখের পলক’। এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে গাওয়া এই গানে ঠোঁট মিলিয়েছিলেন রিয়াজ। নব্বইয়ের দশকের রোমান্টিক গানগুলোর তালিকায় গানটি এখনো শ্রোতাদের কাছে স্মরণীয়।
‘শুধু একবার’: ১৯৯৫ সালের ৩ মার্চ মুক্তি পাওয়া ‘দেনমোহর’ সিনেমায় জুটি বাঁধেন সালমান শাহ ও মৌসুমী। সিনেমাটির ‘শুধু একবার’ গানটি তাদের পর্দার রসায়নের সঙ্গে দর্শকের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে। খালিদ হাসান মিলু ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গানটি সে সময় বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল।
‘এই দিন সেই দিন’: সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালের ১১ মে। আলম খানের সংগীত পরিচালনায় সিনেমাটির গানগুলো সে সময় তরুণদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে ‘এই দিন সেই দিন’ গানটিও রেডিও ও ক্যাসেটের কল্যাণে শ্রোতাদের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠে।
‘সাথী তুমি আমার জীবনে’: ১৯৯৬ সালের ২০ ডিসেম্বর মুক্তি পায় সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’। সিনেমাটির অন্যতম পরিচিত গান ‘সাথী তুমি আমার জীবনে’। গানটি ও সিনেমা-দুটিই সালমান-শাবনূর জুটির জনপ্রিয় সময়কে স্মরণ করিয়ে দেয়।
‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’: নব্বইয়ের দশকের চলচ্চিত্রের গানে ব্যান্ডশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর অংশগ্রহণও ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৭ সালের ৭ নভেম্বর মুক্তি পাওয়া ‘লুটতরাজ’ সিনেমার ‘অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে’ গানটির মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক করেন আইয়ুব বাচ্চু। তার সঙ্গে কণ্ঠ দেন কনকচাঁপা। গানটি সে সময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
‘আম্মাজান’: কাজী হায়াৎ পরিচালিত ‘আম্মাজান’ মুক্তি পায় ১৯৯৯ সালের ২৫ জুন। শবনম, মান্না, মৌসুমী, আমিন খান, ডিপজল ও মিজু আহমেদ অভিনীত সিনেমাটির টাইটেল গান ‘আম্মাজান’ আলাদাভাবে জায়গা করে নেয়। আইয়ুব বাচ্চুর কণ্ঠে গানটি তুমুল জনপ্রিয় হয়। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সংগীতে তৈরি এই গানটি আজও বাংলা চলচ্চিত্রের স্মরণীয় গানগুলোর একটি।
‘আমার মতো এত সুখী’: নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত ও অভিনীত ‘বাবা কেন চাকর’ মুক্তি পায় ১৯৯৭ সালে। সিনেমাটির গল্পের পাশাপাশি ‘আমার মতো এত সুখী নয় তো কারো জীবন’ গানটিও দর্শক-শ্রোতাদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। খালিদ হাসান মিলুর কণ্ঠে গাওয়া গানটির কথা লিখেছেন মোহাম্মদ রফিকউজ্জামান এবং সুর করেছেন আলাউদ্দিন আলী।
‘পাগল মন’: দিলরুবা খানের কণ্ঠে জনপ্রিয় ‘পাগল মন’ গানটি নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। পরে এই গানকে কেন্দ্র করে একই নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন ‘বেদের মেয়ে জোছনা’খ্যাত পরিচালক তোজাম্মেল হক বকুল। সিনেমায় নতুন জুটি মেহেদী ও অন্তরাকে দেখা যায়। দিলরুবা খান ও আগুনের কণ্ঠে গানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
‘প্রেমের সমাধি ভেঙে’: ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায় বাপ্পারাজ ও শাবনাজ অভিনীত ‘প্রেমের সমাধি’। সিনেমাটির ‘প্রেমের সমাধি ভেঙে’ গানটি ব্যাপক শ্রোতাপ্রিয়তা পায়। এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে গাওয়া গানটি নব্বইয়ের দশকের আবেগঘন চলচ্চিত্রের গানের তালিকায় এখনো স্মরণীয়।
‘কী ছিলে আমার বলো না তুমি’:‘কী ছিলে আমার বলো না তুমি’ মূলত মনি কিশোরের অ্যালবামের গান। পরে ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘কে অপরাধী’ সিনেমায় গানটি ব্যবহৃত হয়। সিনেমায় ব্যবহারের পর গানটি আরও ব্যাপকভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। মনি কিশোরের কণ্ঠে গাওয়া গানটিতে পর্দায় ঠোঁট মিলিয়েছিলেন ওমর সানী। সঙ্গে ছিলেন শাবনূর।
‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’: ১৯৯৭ সালে মুক্তি পাওয়া ‘আনন্দ অশ্রু’ সিনেমার ‘তুমি মোর জীবনের ভাবনা’ গানটি নব্বইয়ের দশকের অন্যতম জনপ্রিয় গান। রেডিওর অনুরোধের আসরে এই গানের চাহিদা ছিল তুঙ্গে। সালমান শাহ ও শাবনূর অভিনীত সিনেমাটির এই গানে সালমানের জন্য কণ্ঠ দেন এন্ড্রু কিশোর।
গানটির আরেকটি সংস্করণে শাবনূরের জন্য কণ্ঠ দেন সালমা জাহান। কনকচাঁপার কণ্ঠে কাঞ্চির জন্যও ছিল একটি সংস্করণ। গানটির কথা, সুর ও সংগীত পরিচালনা করেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল।
নব্বইয়ের দশক পেরিয়ে গেছে বহু বছর। বদলে গেছে গান শোনার মাধ্যম, বদলে গেছে সিনেমা দেখার ধরনও। কিন্তু সেই সময়ের গানগুলো এখনো শ্রোতাদের ফিরিয়ে নেয় পুরোনো দিনগুলোর কাছে। তাই নব্বইয়ের দশকের সিনেমার গান শুধু গান নয়, অনেকের কাছেই তা এক টুকরো শৈশব, কৈশোর ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের স্মৃতি।
এমএমএফ


