বিসকেক সম্মেলন ও ভারত-পাকিস্তান
জগতে সময় একরকম যায় না। একসময় গ্রিস, পারস্য দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি ছিল। তারপর আরবরা, অটোমানরা বিশ্ব কাঁপিয়েছে কয়েকশ’ বছর। এরপর ব্রিটিশরা এবং ইউরোপীয়রা। এই চক্রেই অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র একক অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে পরিণত হলো। ইউরোপ, জাপান, কানাডা, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মধ্যপ্রাচ্যের ধনাঢ্য কয়েকটি দেশ এবং ইসরায়েল তো বটেই—সবাই মাথা মুড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মুরিদ হয়ে গেল। প্রকারান্তরে ভারত-পাকিস্তানও যুক্তরাষ্ট্রের অনুগতই।
ইতিহাসে দেখা যায়, সব ক্ষমতাই একসময় ক্ষমতার দাপটে অন্ধ হয়ে যায় এবং পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। যারা শত শত বছর ধরে শাসন করেছে বংশপরম্পরায়, তাদেরও যবনিকাপাত ঘটেছে হয় স্ট্র্যাটেজিক ভুল অথবা অন্ধত্বের কারণে। এবার বুঝি ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় যুক্তরাষ্ট্রের পালা।
সম্প্রতি ইরান যুদ্ধ ও ইউক্রেন যুদ্ধের পরিণাম হিসেবে বিশ্বশক্তির কাঠামোতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে, যা একমেরুকেন্দ্রিক আটলান্টিক-ভিত্তিক হেজিমনি থেকে একটি জটিল, বহুমেরুকেন্দ্রিক ইউরেশীয় বাস্তবতার দিকে দ্রুতই ধাবিত হচ্ছে। তারই একটি বহিঃপ্রকাশ সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) ২৬তম শীর্ষ সম্মেলন। এই জোটের ২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে গৃহীত বিশকেক ঘোষণাটি কেবল একটি রুটিনমাফিক কূটনৈতিক ইশতেহার নয়; এটি একটি ভূ-রাজনৈতিক মাইলফলক, যা পশ্চিমা অর্থনৈতিক ও কৌশলগত আধিপত্যের নিশ্চিত ক্ষয়কে দৃশ্যমান করে তুলেছে।
সম্পর্কের ভিত্তিতে চীনের উত্থান এবং রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক শক্তি ভারতের জন্য একটি স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। যখন ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্রগুলোর মতো দেশগুলো বিসকেকে একই টেবিলে বসে একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পথ তৈরির আলোচনা করে, তখন তার গুরুত্ব অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই।
বিশকেক ঘোষণার প্রকৃত গুরুত্ব বুঝতে হলে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষক জেফরি স্যাকসের বক্তব্যের দিকে তাকাতে হবে। স্যাকস অনেক দিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, ওয়াশিংটন এবং পশ্চিম ইউরোপের নেতৃত্বাধীন একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থাটি কাঠামোগতভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। তিনি মনে করেন, ‘এটি মূলত একটি পুরোনো ‘জিরো-সাম’ মানসিকতা দ্বারা চালিত, যা বিশ্বের বাকি অংশের বৈধ অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত আকাঙ্ক্ষা ও প্রয়োজনকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছে।’
তার মানে ইউরেশীয় অক্ষ কয়েক দশক ধরে পশ্চিমা পররাষ্ট্রনীতিতে ‘হেজিমোনিক স্ট্যাবিলিটি থিওরি’র অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছিল। কিন্তু রাশিয়া, চীন এবং ভারতের মতো পরাশক্তিগুলোসহ এসসিওর দশটি সদস্য রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত বিসকেক ঘোষণা বিশ্বের ক্ষমতার ভরকেন্দ্রের একটি গভীর বাঁক পরিবর্তন করে দিল।
বিশকেক ঘোষণায় স্বাক্ষরকারী দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের দ্বারা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত একতরফা নিষেধাজ্ঞা ব্যবস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই জোট মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক নির্ভরযোগ্যতাকে ক্ষুণ্ন করেছে, সরবরাহশৃঙ্খলকে ভেঙে দিয়েছে এবং গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের দেশগুলোকে বিকল্প আর্থিক, লজিস্টিক ও কূটনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত করতে পথ দেখাচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য গভীর করা, স্থানীয় মুদ্রা ব্যবহার করা এবং আঞ্চলিক পরিবহন করিডোর সম্প্রসারণের ওপর এসসিওর এই মনোযোগ সেই সুরক্ষারই একটি বাস্তব বহিঃপ্রকাশ।
ভারত, চীন এবং রাশিয়ার বিশকেক ঘোষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি হলো এর ঐকমত্যের পরিধি। এসসিওভুক্ত দেশগুলোতে বিশ্বের মোট ৪০ শতাংশ মানুষ বাস করে এবং বিশ্ব অর্থনীতির ৩০ শতাংশ এরা নিয়ন্ত্রণ করে। শীর্ষ সম্মেলনটিকে গুরুত্ব দেওয়া বিশ্লেষকরা ভারতের এই ঐকমত্যে যোগ দেওয়া এবং বিশকেক ডিক্লারেশনে স্বাক্ষর করাকে বিপুল তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন।
যে ভারত যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘোষিত কৌশলগত অংশীদার ‘কোয়াড’-এর সদস্য, সেই ভারত এমন এক ঘোষণাপত্রে সম্মতি দিয়েছে, যা প্রকাশ্যেই পশ্চিমা-নেতৃত্বাধীন সামরিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এই প্রথম ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের চোখে নেতিবাচক কোনো সংস্থায় গুরুত্বের সঙ্গে স্বাক্ষর করেছে। বলতে হয়, ভারত এবার সঠিক কাজটিই করেছে।
সম্পর্কের ভিত্তিতে চীনের উত্থান এবং রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক শক্তি ভারতের জন্য একটি স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। যখন ভারত, চীন, রাশিয়া, পাকিস্তান, ইরান এবং মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্রগুলোর মতো দেশগুলো বিসকেকে একই টেবিলে বসে একটি সম্মিলিত নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক পথ তৈরির আলোচনা করে, তখন তার গুরুত্ব অস্বীকারের কোনো সুযোগ নেই।
শুধু তাই নয়, বিশকেক ঘোষণায় পরিষ্কারভাবে ইরানের ওপর হামলা করায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি নিন্দা জানানো হয়েছে। এটি পশ্চিমের কাছ থেকে চরম অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন হওয়া ইরানকে একটি আনুষ্ঠানিক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করার পরিষ্কার ইঙ্গিত। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিবর্তে, নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন রাষ্ট্রগুলো বৃহত্তর ইউরেশীয় কাঠামোর মধ্যে নিজেদের যুক্ত করতে পারছে, যা পশ্চিমা নির্দেশ বা হুকুম সরাসরি প্রত্যাখ্যানের শামিল।
বিশকেক ঘোষণার অধীনে একতাবদ্ধ হওয়া দেশগুলো অর্থনৈতিক বাস্তববাদের দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে। মধ্য এশিয়াজুড়ে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড-সম্পর্কিত করিডোরের মতো উদ্যোগগুলো ল্যান্ডলক দেশগুলোকে বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি প্রবেশাধিকার দিচ্ছে, যা ঐতিহাসিকভাবে পশ্চিমা নৌবাহিনীর আধিপত্যে থাকা সমুদ্রপথের বাধাগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার বড় সুযোগ।
বিশকেক ঘোষণায় সহযোগিতামূলক নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই সংগঠন কোনো অপরিচিতি সংগঠন নয়। এটি গত প্রায় তিন দশক ধরে পশ্চিমা হস্তক্ষেপবিরোধী। এসসিওর উপস্থাপিত নীতিটি সপ্তদশ শতাব্দীর জার্মানির ওয়েস্টফ্যালিয়ান চুক্তির মতো: সার্বভৌম রাষ্ট্রগুলো কোনো আদর্শিক পূর্বশর্ত ছাড়াই বাণিজ্য, জ্বালানি এবং সীমান্ত নিরাপত্তার বাস্তবসম্মত ভিত্তিতে একে অপরকে সহযোগিতা করবে, কেউ কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।
কয়েক শতাব্দী ধরে বহিরাগত সাম্রাজ্যগুলোর ‘গ্রেট গেম’-এ এই অঞ্চলটিকে অনেকটাই পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে আসছিল পশ্চিমারা। এখন উজবেকিস্তান, কাজাখস্তানসহ মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া এবং তাদের প্রতিবেশীদের মতো দেশগুলো সক্রিয়ভাবে নিজেদের কর্তৃত্ব ও ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে। তাই বিশকেক সম্মেলন এবং ডিক্লারেশন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে এই বিশকেক সম্মেলন ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে একটি জটিল পরীক্ষায় ফেলেছে। ভারতকে এতকাল ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখতেই হয়েছে। বিশেষ করে বাণিজ্যের নির্ভরশীলতা, সফটওয়্যার রপ্তানি—এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জরুরি। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ভারতের গভীর সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা এখন বহুগুণ কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে।
একতরফাভাবে ভারতের সঙ্গে বহু ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অসহযোগিতা ভারতের জনগণকে বিস্মিত করেছে। এটি একটি নতুন ফেনোমেনা। এমনকি ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে অপারেশন সিন্দুরের চার দিনের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি ও আচরণে ভারতের প্রতি কোনো সিমপ্যাথিই লক্ষ করা যায়নি।
ভারত সম্ভবত বুঝতে পেরেছে যে, কোয়াড নামে যে চীনবিরোধী সংগঠনটি তৈরি করা হয়েছিল, তা কেবলই ভারতকে চীনের বিরুদ্ধে ব্যবহারের জন্য। কোয়াড ভারতের অন্য কোনো উপকারে আসবে না বা আসেনি। ভারত এটাও বুঝতে পেরেছে যে, কোয়াড জোরালো হওয়ার আগেই মুখ থুবড়ে পড়েছে।
অন্যদিকে এসসিওর অন্যতম সদস্য রাশিয়া ভারতের দীর্ঘকালের বন্ধু, যার সঙ্গে চীনের সম্পর্ক অত্যন্ত জোরালো। দীর্ঘকাল ধরে পশ্চিমা প্রচারণায় এবং উৎসাহে ভারতে যে সিনোফোবিয়া গড়ে উঠেছিল, তা এখন কাটিয়ে ওঠার সময় হয়েছে। চীন-ভারত সীমান্ত সমস্যা আছে। কিন্তু সেটা জোরালো কূটনৈতিক সম্পর্কের মধ্য দিয়ে যে সমাধান সম্ভব, এটা ভারতের বোঝার এখনই সময়।
এদিকে ভারত-পাকিস্তানের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের বৈরিতা আছে। এসসিও সম্মেলনে পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সন্ত্রাসে মদদদানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁর বক্তব্যে বলেছেন, সন্ত্রাস খোদ পাকিস্তানের জন্যও একটি সমস্যা। এই ধরনের ফোরামে এভাবে আলোচনা হলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা অনেকটাই প্রশমিত হতে পারে।
গ্লোবাল সাউথের সবচেয়ে বড় সংস্থা ব্রিকসের অন্যতম সদস্য ভারত। এসসিও এবং ব্রিকস—এই দুটি সংগঠনই কিন্তু পরোক্ষভাবে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী। ব্রিকস প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের যথেষ্ট মাথাব্যথা রয়েছে। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের সম্মেলন বসতে যাচ্ছে।
আগামী বছর এসসিওর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে পাকিস্তানে। সেখানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত হবেন কি না, সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে চীন-রাশিয়ার লবিংয়ের কারণে অবস্থা পাল্টে যেতে পারে। পাকিস্তানের রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যদিও সে সম্পর্ক চীনের সঙ্গে সম্পর্কের চেয়ে বড় নয়।
ভারতের জন্য বিষয়টি খুবই জটিল এই কারণে যে, চীন বা রাশিয়ার মতো ভারত যুক্তরাষ্ট্রকে টেক্কা দিতে পারছে না অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে। তবে ১২-১৩ তারিখের ব্রিকস সম্মেলন আমাদের সামনে হয়তো আরও অনেক কিছু পরিষ্কার করবে।
লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক
এইচআর/এএসএম
